সার্ধশতবর্ষে বিশ্বকবি

আমরা কে না রবীন্দ্রনাথকে এবং তাঁর সৃষ্টীকে ভালবাসি? রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা আমাদের বিস্ময় জাগায়। তিনি ছিলেন আমাদেরই মত রক্তমাংসের মানুষ। তিনি সাধারন মানুষের নিয়মকানুন মেনেই মনুষ্যত্বের সর্বোত্তম শিখরে আরোহন করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। আজ  রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি  আমাদের গর্ব, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায়, একাশি বছর ধরে কম আবহেলা, অবজ্ঞা ও অসম্মান ভোগ করেননি। আজ আমরা তা জেনে বিস্মিত হই। তাঁর জীবনে বারে বারে দুঃখ শোক নেমে এসেছে।
আমরা এই প্রজন্মের মানুষেরা এই বিস্ময় প্রতিভা সম্বন্ধে যতটুকু জানি তাঁর চেয়েও কম জানি মানুষ রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে। তাই এই সার্ধশতবর্ষে, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কিছু সংবাদ সংগ্রহ  করে পরিবেশন করার চেষ্টা করলাম ।
  • রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাবামায়ের চতুর্দশ (14th) সন্তান। এর পরেও আর একটি সন্তান হয়েছিল (বুধেন্দ্রনাথ) কিন্তু বেশীদিন বাঁচেনি। তাই রবীন্দ্রনাথ কনীষ্ঠতম সন্তান বললে ভুল হবে।
  • রবীন্দ্রনাথের  কৌলিকপদবি বন্দ্যোপাধ্যায় ছিল। শান্ডিল্য-গোত্রীয় ভট্টনারায়ন থেকে ঠাকুর পরিবারের উদ্ভব। একি বছরে (1861)জন্মেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র সরকার ও কিম্বদন্তী চিকিৎসক ডঃ নীলরতন সরকার।
  • ভাগ্নের কাছে কাব্যে হাতেখড়ি। শ্লেটে লেখা সে কবিতা আর নেই। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক সাতকড়ি দত্ত দু লাইন লিখে প্রিয় ছাত্রকে পাদ পুরন করতে বললেন। মাষ্টার লিখলেন – 
রবি করে জ্বালাতন আছিল সবাই। 
বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই।

আমাদের কবির পাদপুরন —

মীনগন হীন হয়ে ছিল সরোবরে
এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে।

আত্মঘাতিনী বৌঠান –   জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাথে কাদম্বরি দেবীর বিয়ে হয় অর্থাৎ কাদম্বরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বৌঠান বা বৌদি। প্রায় ষোল বছর বিবাহিত জীবন যাপনের পর তিনি আত্মঘাতী হয়ে কবির মনে গভীর শোকের ছায়া রেখে যান। তিনি উপেক্ষিতা এবং একাকি  তাই হয়ত সমবয়সী দেবর রবীন্দ্রনাথের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় তাঁর উপস্থিতি। এঁর আত্মাকে প্ল্যানচেটে আহবান করতেন কবি।
    কাদম্বরী দেবী
     মৃনালিনী দেবী রবীন্দ্রনাথের যখন বয়স বাইশ বছর তখন ১১ বছরের মৃনালিনী দেবীর সাথে তাঁর বিয়ে হয় ৯ ডিসেম্বর ১৮৮৩ । বিয়েতে খরচ হয়েছিল ৩২৮৩ টাকা ৩ পাই। তাঁদের তিন কন্যা, দুই পুত্র । মাধুরীলতা (১৮৮৬-১৯১৮),রথিন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১), রেনুকা (১৮৯১-১৯০৩), মীরা (১৮৯৪-১৯৬৯) ও শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬-১৯০৭)। বিধাতার খেয়ালে রবীন্দ্রনাথ নির্বংশ হয়েছেন।মৃনালিনীর মারা যান ২৩ নভেম্বর ১৯০২। জ্যেষ্ঠপুত্রের সন্দেহ মায়ের এপেন্ন্ডিসাইটিস হয়েছিল, কিন্তু ছিকিৎসা হোমিওপ্যাথিক।এক মাস ধরে অহোরাত্র স্ত্রীর সেবা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

    মৃনালিনী দেবী  
    নিন্দুকেরা ছুটি নেননি, মাঝে মাঝে গুজব রটিয়েছেন দ্বিতীয় বিবাহের।এ নিয়ে নাটক লিখে রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করতে গিয়ে টেবিলচেয়ার ভাঙ্গাভাঙ্গি হয়, নিন্দুক নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মঞ্চের পিছনের দরজা দিয়ে পালান।
    পত্নীবিয়োগের পর শোকের পর শোক। কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের অকালমৃত্যু তেরো বছর বয়সে ১৯০৭ সালে। জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতার মৃত্যু ক্ষয়রোগে ৩২ বছর বয়সে। মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে শ্বশুরের সম্পর্ক সুখের হয়নি। 
    ধারদেনা  ধনপতি প্রিন্স দ্বারকানাথ  ঠাকুরের পৌত্র, কিন্তু কখনও সাচ্ছল্য, কখনও  অভাবের মধ্যে কাটিয়েছেন। পাটের ব্যাবসায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। চড়া সুদে বন্ধুদের এবং আত্মীয়দের কাছে টাকা ধার করেছেন। স্ত্রীর গহনা বিক্রী করেছেন। বিলেতের  ডাক্তার অপারেশনের ফি মুকুব করেছেন।
    নোবেল প্রাইজ – ১৪ নভেম্বর ১৯১৩ সালে নবেল কমিটি কবির জোড়াসাঁকোর বাড়ীতে বার্তা পাঠায় এবং মুল্য বাবদ  ১,১৬,২৬৯ টাকার চেক এসেছিল চার্টার্ড ব্যাংক মারফৎ । প্রাইজের টাকা থেকে কিছুটা দেনা শোধ হল, বাকিটা নিজেদের কৃষি ব্যাঙ্কে রেখে সে টাকা নয়ছয় হয়। 
    নোবেলের পরও  ঢালাও কুৎসা – নিন্দুকেরা বলে বেড়াল যে এই বই নোবেল পুরস্কার পেয়েছে  এটা রবীন্দ্রনাথের লেখাই নয়। ইয়েট লিখে দিয়েছেন। কেও বলল প্রচন্ড লবি করেছেন, কেও বলল বিচারকদের পিছনে টাকা খরচ করতে হয়েছে। কলকাতার লেখকরা  বললেন,  তাঁরা কম যান না। তাই নিজেদের বই সত্ত্বর সুইডেনে নোবেল কমিটির কাছে পাঠাতে লাগলেন।
    নিজের খরচে বই ছাপানো – প্রথম বই “কবি কাহিনির” প্রকাশ ১৮৭৮, ৫৪ পৃষ্ঠার বই, দাম ছয় আনা। মুদ্রন সংখা মাত্র ৫০০ কপি। পত্রপত্রিকায় ভাল সমালোচনা সত্ত্বেও বই বিক্রি হয়নি।
    হতাশ রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন “এই বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেলফ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।” মাঝে মাঝে যৎসামান্য টাকায় স্বত্ত্ব বন্ধক রেখে নামী প্রকাশক মিলেছে, কিন্তু তাঁদের কারুর সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো হয়নি। প্রবঞ্চিত কবি কয়েকক্ষেত্রে তাদের নামে আদালতে মামলা করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন।প্রচারের জন্য থিয়েটারে বই বিক্রির চেষ্টায় উৎসাহ দিয়েছিলেন কবি কিন্তু তেমন ফল হয়নি। কখনও  কখনও একসঙ্গে কিছু বই কিনবার জন্য বড়লোকদের কাছে ধর্না দিয়েছেন, ফল হয়নি। কখনও উপার্জনের জন্য পাঠ্যপুস্তকও লিখেছেন, কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সমসময়ে কলকাতা বিশ্বাবিদ্যালয় তা নামঞ্জুর করেছেন। 
    বই আছে বিক্রি নেই – এক সময় প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়কে ১১০০ টাকা অগ্রিম নিয়ে বারোটি বইয়ের  বিক্রয়সত্ত্ব দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপণে দাবী করা হয়েছিল – “ছাপা পরিষ্কার, কাগজ অতি উৎকৃষ্ট, লেখা ভাবুকতায় পুর্ন।… যথেষ্ঠ কমিশন দেওয়া হবে।” বিক্রিতে হতাশ কবি এক সময়ে পুর্ব্ববঙ্গের এক প্রকাশকেরও শরনাপন্ন হয়েছিলেন।বিদেশে যাবার জন্য কিছু টাকার বিশেষ প্রয়োজনে। অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না তাই নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর বিশ্বাভারতী গ্রন্থন বিভাগ স্থাপন করে লেখক রবীন্দ্রনাথ কিছুটা নিশ্চিত হয়েছিলেন।
    বই বিক্রি না থাকলেও সাধনার অন্ত ছিল না – লিখে উপার্জন করতে পারেননি, একথা অসহায় কবি চিঠিপত্রে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু বই বিক্রি যাই হোক  লেখক রবীন্দ্রনাথের সাধনার অন্ত ছিলনা ।   কবির পুত্রবধু প্রতিমা দেবি বলেছেন ” তাঁর ঘুম ছিল খুব কম। কখন যে তিনি ঘুমোতেন আমরা কেউ জানতে পারতাম না। ভোর তিনটেয় উঠতেন। ঠিক চারটেয় চা। সাতটা পর্যন্ত একনাগাড়ে লেখা । সাতটায় ব্রেকফাস্ট, আবার লেখা এগারোটা পর্যন্ত। তারপর স্নান।স্নানের পরেই খেতে বোসতেন। খাওয়ার পর ঘুম ত নয়ই, বিশ্রামও নয় – পড়াশোনা। বিকেল চারটায় চা। রাতের খাবার সন্ধ্যে সাতটায়। তারপর রাত বারোটা পর্যন্ত আবার লেখাপড়া।”
    বিড়ম্বনা – ১১ আগষ্ট ১৯১০ গীতাঞ্জলির পান্ডুলিপি প্রেসে যায় এবং প্রকাশ ৫ সেপ্টেম্বর । এক সপ্তাহ পরে কবি  তাঁর পরিচিত এক পত্রিকা সহসম্পাদককে অনুরোধ করেছেন, তাঁর দ্বিতীয় বিবাহের গুজবের প্রতিবাদ করতে।
    কিছুদিন পরে কবিকে সংবর্ধনা দেবার প্রস্তাবে এমনই দলাদলি যে অপমানিত কবি লিখেছেন – “আমাদের দেশে জন্মলাভকে একটা পরম দুঃখ বলিয়া থাকে, কথাতা যে অমুলক নহে তাহা আমার জন্মদিনে….. বিশেষভাবে  অনুভাব করিবার কারন ঘটিল।
    অনুবাদে প্রারম্ভিক ব্যর্থতা –  ইংরেজি অনুবাদের চেষ্টা নানাভাবে হয়েছিল। প্রথম অনুবাদকদের মধ্যে রয়েছেন স্যার যদুনাথ সরকার। জগদীশচন্দ্রের সহায়তায় নিবেদিতা তিন্তি গল্প অনুবাদ করে ইংল্যান্ডের পত্রিকায় পাঠান, কিন্তু রিজেক্ট হয়, পান্ডুলিপিও হারিয়ে যায়। 
    হারানো প্রাপ্তি – বিলেত যাবার পথে জাহাজে রবীন্দ্রনাথ নিজে গীতাঞ্জলীর যে ইংরেজি অনুবাদ করেন সেই খাতাটিও পুত্র রথীন্দ্রনাথ লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে ফেলে আসেন, অথচ পরের দিন সবেধন নীলমনি এই পান্ডুলিপিটি কবি রোটেনস্টাইনকে দেবেন। বিপর্যস্ত রথীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের পরম দয়ায় পরের দিন – LOST & FOUND অফিসে খাতাটি পান, না হলে ভাগ্যের ধারা অন্যদিকে প্রবাহিত হত।

    স্মরনীয় রবীন্দ্রনাথ – সার্ধশতবর্ষে বিড়ম্বিত এই রবীন্দ্রনাথকে আমাদের স্মরন করা প্রয়োজন, তা না করলে আরও দেড়শ বছর পর তাঁর সৃষ্টির আমৃতসাগরে  অবগাহন করেও মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথ বলে কোনও মানুষ এই পৃথিবীতে ৮১ বছর বসবাস করেননি, স্বর্গলোক থেকে কোনও অদৃশ্য শক্তি তাঁর অমৃতবানীগুলিকে মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিল। 

    তথ্যস্বীকৃতিটাইমস্‌ অফ্‌ ইন্ডিয়া প্রকাশিত “সোনারতরী” ক্রোড়পত্র থেকে (08/5/10)।
    Advertisements

    Leave a Reply

    Fill in your details below or click an icon to log in:

    WordPress.com Logo

    You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

    Twitter picture

    You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

    Facebook photo

    You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

    Google+ photo

    You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

    Connecting to %s