Love marriage

shubhadrishti2বন্ধ লিফ্টের ভিতরে বলছি মিসেস রায় ,একটা কথা …কিছু মনে করবেন না…আপনার মেয়েটা কি জন্ম থেকেই এমন খোঁড়া? নন্দিতা বেশ হাসি মুখে বললো, হ্যাঁ গো ..জন্ম থেকেই ওর একটা পা ডিফেক্টিভ। মিসেস রায়, কিছু মনে করবেন না.. এই মেয়ের কি করে বিয়ে দেবেন? নন্দিতা আরেকটু হেসে বললো, আপনি আমার মেয়ের জন্য এতটা চিন্তা করছেন দেখে খুব খুশি হলাম। কিন্তু মিসেস সেন ..আমি তো আমার মেয়ের বিয়ের কথা ভাবিনি এখনো। ও তো সবে ক্লাস নাইন।
মিসেস সেন সাত তাড়াতাড়ি বললেন, আর নন্দিতা আমাকে তুমি রিক্তা বলেই ডেকো। একই কমপ্লেক্সের বাসিন্দা আমরা , পাশাপাশি থাকবো। মিসেস সেন, মিসেস রায় টা বড় অপরিচিতের মত লাগে।
নন্দিতা হাসি মুখে বললো, মাত্র মাস খানেক এসেছি। সব অভ্যাস হয়ে যাবে। রিক্তাদি আরেকটু কৌতূহলী হয়ে বলল, মিস্টার রায় তো বেশ বড় সর চাকরি করেন।তা শ্বশুর বাড়িতে কেউ এই খোঁড়া মেয়ে নিয়ে তোমাকে খোঁটা দেয়নি তো নন্দিতা? খোঁটা দিলেই কিন্তু বলো আমাকে। আমি ‘কুন্তলা ‘মহিলা সমিতির সেক্রেটারী। আমাদের কাজই তো নিপীড়িত, অত্যাচারিত মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো। নন্দিতা হেসে বললো, এখনো পর্যন্ত পৌলমিকে নিয়ে আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী কিছু বলেননি রিক্তা দি, যদি কোনোদিন দরকার হয় তো নিশ্চয় বলবো।
সামনেই পৌলমীর এক্সাম। নন্দিতা চাইছিল না ওর কানে এই ধরণের কথা গুলো যাক। তবুও বাড়ি বয়ে উপকার করতে আসা রিক্তা দিকে এবার আসুন… কথাটা বলতেও পারলো না। পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নন্দিতার ব্যক্তিগত জীবনে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে রিক্তাদি নিজের ফ্ল্যাটে ফিরলেন। আসলে অঞ্জনের ইচ্ছাতেই এই ঢাকুরিয়ার কাছে ফ্ল্যাটটা কেনা হলো। অঞ্জন বলেছিল,ওই জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকলে পৌলমীকে নিশ্চিন্তে মানুষ করা সম্ভব নয়। রোজই কোনো না কোনো আত্মীয় এসে পৌলমীর বাঁ পায়ের প্রবলেম নিয়ে অতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ওদের অতিরিক্ত আগ্রহই পৌলমীর সংকোচের কারণ।
নন্দিতাও স্বামীর কথায় সায় দিয়েছিল। তারপরেই ঢাকুরিয়া এই ফ্ল্যাট।
এখানে এসেও শান্তি নেই। থার্ড ফ্লোরের রিক্তাদি, সেকেন্ড ফ্লোরের সীমা বৌদির আন্তরিকতায় জর্জরিত হচ্ছে নন্দিতা। এদের আবার পৌলমীর মত খোঁড়া মেয়ের বিয়ের চিন্তায় রাতের ঘুম চলে গেছে। মাঝে মাঝে খুব ভেঙে পড়ে নন্দিতা। মনে হয় পৌলমীকে নিয়ে যে যুদ্ধটা ও চালাচ্ছে সেটা কি সফল হবে।ছোট্ট পৌলমীর বাঁ পায়ের পাতাটা একটু বাঁকা ছিল। তাই ছোট বেলায় হাঁটতে শেখার সময় ও খালি ধুপধাপ করে পড়ে যেতো। নন্দিতা ওর পায়ে পরিয়ে দিয়েছিল বিশেষ জুতো। সেদিন থেকেই পৌলমী ওই পাটাকে একটু টেনেই চলে। প্রথম প্রথম নন্দিতার কষ্ট হলেও পরে পৌলমীর কথা ভেবেই চোখের জল মুছেছে। অঞ্জন বলতো, পৌলমী আমাদের সন্তান, তাই ওকে সাফল্যের পথে পৌঁছে দেবার দায়িত্বটা কিন্তু আমাদের।
ট্রেনে, বাসে, স্কুলে সব জায়গায় উত্তর দিতে দিতে বড় হয়ে উঠেছে পৌলমি।
সামনেই ওর মাধ্যমিক। রাত জেগে পড়ছে ও। পরীক্ষাগুলো ওর কাছে চ্যালেঞ্জ। বন্ধুদের মত ও ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারেনা। বন্ধুদের মত কোনোদিন স্কুলের স্পোর্টসে নাম দিতে পারেনি। তাই বইয়ের অক্ষরগুলোই ওর লক্ষ্য।পৌলমীর মাধ্যমিক শেষ। অঞ্জন বললো, আচ্ছা বেড়াতে গেলে কেমন হয়? পৌলমী সবার আগে আপত্তি জানালো। না না, আমি সাইন্স নিয়ে ভর্তি হবো ,তাই কাল থেকেই ম্যাথ শুরু করতে চাই। অঞ্জন বললো, মেয়ে যখন সিরিয়াস তখন আমরা নিরুপায়। তবে ইদানিং নন্দিতা মেয়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখছে। বিকেল হলেই পৌলমি লিফ্ট এ করে উঠে যায় ফ্ল্যাটের ছাদে। আগে কখনো ছাদে উঠতে চাইতো না। বড্ড ঘরকুনো ছিল। যাক বাবা, নতুন ফ্ল্যাটটা যে ওর পছন্দ হয়েছে এটাই অনেক।
তোমার ম্যাথ কেমন হয়েছে ? বেশ ভালো।
তোমার কেমিস্ট্রি থার্ড পেপার কেমন ছিল?
মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া পৌলমীর সাথে ছাদের কোনায় গল্প করছে রক্তিম। রক্তিম কেমিস্ট্রি নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। এই কমপ্লেক্সেই থাকে। সেদিন হঠাৎ বৃষ্টি আসায় পৌলমীকে মা পাঠিয়েছিল ছাদ থেকে জামা কাপড় গুলো তুলে আনতে। পৌলমী বৃষ্টিকে হারিয়ে একা পেরে উঠছিল না। আরেকটু হলেই দক্ষিণ দিকের কাপড়গুলো ভিজে যেত। সেই অবস্থায় হঠাৎই একটা মুখ চেনা ছেলে এসে ওর সাথে জামা কাপড় তুলতে থাকে । পৌলমী বলেছিল, থ্যাংকস…
ছেলেটি হেসে বলেছিল, আমি রক্তিম থার্ড ফ্লোরে থাকি।
পৌলমী বলেছিল, বৃষ্টি আসছে তো তুমি নেমে এস।
কাঁধ উঠিয়ে হেসেছিল রক্তিম।
ধুর! পালাবো কি ? আমি তো বৃষ্টি আসছে দেখেই ছাদে এলাম। বলতে বলতেই হুড়মুড়িয়ে নেমেছিল বৃষ্টি। পৌলমী তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল দুহাত ভর্তি শুকনো জামা কাপড় নিয়ে।
বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। পৌলমীর বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল, ওই এলোমেলো, অগোছালো ছেলেটাকে। যে কিনা ভিজবে বলেই ছাদে উঠেছে। আর ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে পারেনি। রক্তিমের ভেজা দেখবে বলেই মায়ের চোখ বাঁচিয়ে উঠে গিয়েছিল ছাদে।
রক্তিম দুহাত আকাশে দিকে করে বৃষ্টিকে আহ্বান জানাচ্ছিলো। পৌলমীকে দেখেই হাত নেড়ে ডেকেছিল। বলেছিল, দেখো বৃষ্টিরা কথা বলে।
কৌতূহলী হয়ে কান পেতেছিলো পৌলমী। রক্তিম বললো, শুনতে পাচ্ছ ..বৃষ্টিরা বলছে…পৌলমী খুব মিষ্টি মেয়ে। ওর সাথে বন্ধুত্ব করা উচিত।
ধ্যাৎ মিথ্যেবাদী …বলেই সরে গিয়েছিল পৌলমী। তারপর থেকেই সকলের অলক্ষ্যে ওদের বন্ধুত্বটা গড়ে উঠেছিল।
না, ফ্ল্যাটের কারোর সামনে রক্তিম কিছুতেই কথা বলতো না পৌলমীর সাথে। রক্তিম বলতো, ওদের বন্ধুত্বের সাক্ষী থাকবে…নীল আকাশ, উদাস বাতাস, বৃষ্টির নোনা জল।
সবার অলক্ষ্যেই ওরা বড় হয়ে উঠলো একই কমপ্লেক্সে।
রক্তিম এখন এমসিএ করছে।
পৌলমীরও সেকেন্ড ইয়ার।
হাউজিংয়ের দুর্গাপূজায় লাল শাড়ি পরে অঞ্জলী দিয়েছে পৌলমী। দুটো মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি বারবার ছুঁয়ে গেছে ওকে। কানের কাছে অঞ্জলীর মন্ত্রের সাথেই উচ্চারিত হয়েছে…
এত সেজেছ কেন? সকলে তাকাচ্ছে যে আমার বউটার দিকে।
লজ্জায় রাঙা হয়েছে পৌলমীর গাল।
সন্ধ্যেতে সবাই যখন ব্যস্ত থেকেছে পুজোর হিড়িকে। তখন দুটো ছায়া মূর্তির ফিসফিস শোনা গেছে, লিফটের বন্ধ দরজার ভিতরে।
কি হচ্ছে রক্তিম?
প্রতিটা ফ্লোরে লোক দাঁড়িয়ে আছে। তুমি একবার ছয় তলায় উঠছ .. একবার গ্রাউন্ডে নামছ…
এবার লিফ্ট থেকে বেরও, লোকে সন্দেহ করবে যে।
রক্তিম নিজের ঠোঁটে হাত ছুঁইয়ে বলেছে, লিফ্ট থেকে বেরোনো তো তোমার হাতে পৌলমী ! একটা…প্লিজ।
পুজো মণ্ডপে হাসির রোল..তার মধ্যেই রিক্তাদি বললো, ওমা নন্দিতা আজ পৌলমীকে শাড়ি পরে ভারী মিষ্টি লাগছিলো। ও যখন চুপ করে বসেছিলো তখন বোঝাই যাচ্ছিল না ওর পায়ের প্রবলেম টা। এত আলোর রোশনাই এর মধ্যে নিমেষে কালো হয়ে গিয়েছিল নন্দিতা মুখটা। রিক্তাদির কথায় সায় দিয়ে অনেকেই বলেছিল, সেকেন্ড ইয়ার তো হলো, বেশ বড় হয়ে গেল পৌলমী। এত মিষ্টি মেয়েটা,অথচ পায়ের জন্য কি করে যে বিয়ে হবে কে জানে?
নন্দিতার মনে হচ্ছিল,এদের কারোর সংসারে কোনো সমস্যা নেই। একমাত্র সমস্যা পৌলমীর বিয়ে। হঠাৎই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পৌলমী বললো, ও কাকলী কাকিমা.. কাল কাকু অনেক রাতে টলতে টলতে ফিরলো, ঘরে ঢুকেই চিৎকার করছিল… তোমাকে মারে নি তো ? আমি জানালার ধারে বসে পড়ছিলাম তাই দেখতে পেলাম।
কাকলি কোনোমতে আঁচল ঠিক করে বললো, আসলে তোর কাকু বড় চাকরি করে তো তাই ওসব একটু খেতে হয়। নন্দিতা দেখলো, তার সেই মুখচোরা ঘরকুনো মেয়েটা বেশ কথা বলতে শিখেছে। রাতে শুয়ে অঞ্জনকে বলল, শুনছো…তোমার মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রেম করছে। অঞ্জন এক মুখ হেসে বলেছিল, ভালো তো। নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করলে মন্দ কি?
নন্দিতা বলেছিল, ছেলেটা যে কে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
শোনো রক্তিম, আমি কিন্তু চাকরি না পেয়ে বিয়ে করবো না। রক্তিম বললো, তোমার কি মনে হয় আমি এখুনি তোমাকে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। আরে আমিও আগে সেটেল হই।
তাছাড়া আমি শুনেছি, যাদের একটা পা একটু জখম হয় তাদের আরেকটা পায়ে কাকাবাবুর মত জোর থাকে। তাই এখন থেকেই তোমার লাথি খাওয়ার ইচ্ছে নেই।
দুমদাম দুটো কিল মেরে পৌলমী বললো, তাদের হাত দুটোও বেশ শক্ত হয়।
এদিক ওদিক তাকিয়ে ফট করে একটা চুমু খেয়ে রক্তিম বললো, আর তাদের ঠোঁটটা ভীষণ মিষ্টি হয়।
রক্তিম সেদিন বলেছিল, শোনো পৌলমী… নিজের পায়ের ওই সমান্য ডিফেক্ট নিয়ে যদি হীনমন্যতায় ভোগ তাহলে আর আমাকে ভালোবেসো না। কেউ কিছু বললেই দেখেছি তুমি বড্ড সংকুচিত হয়ে যাও। তুমি কি তাদের পায়ে হাঁটছ?
সেদিনের পর থেকেই মুখ খুলেছে পৌলমী।
রক্তিম জব জয়েন করেছে।
আজ সেই উপলক্ষ্যে হাউজিংএর লনে একটা ছোট্ট পার্টি আছে।
সন্ধ্যের স্ন্যাকস, কোল্ডড্রিং।
আজ একটু বেশিই সেজেছে পৌলমী।
পিঠের শিরা দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যাচ্ছে ওর।
কাকলী কাকিমা মাকে বলছে, ইচ্ছে তো আছে সামনের মাসেই নীলাঞ্জনার সাথে রক্তিমের রেজিস্ট্রিটা করিয়ে দেবার। আসলে রক্তিমের বাবা আর আমার হাজবেন্ড তো অফিস কলিগ। তাই ওদের দুজনেরই খুব ইচ্ছে। মা হাসছে, বলছে এটা তো খুব ভালো হবে। নীলাঞ্জনা আর রক্তিমকে খুব ভালো মানাবে।
হালকা গোলাপি নেটের শাড়িটা একঝটকায় খুলে ফেললো পৌলমী। ম্যাচিং অর্নামেন্টস বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মা বললো, কিরে সাজগোজ খুললি কেন? নিচে পার্টিতে যাবি না?
না আমি কোথাও যাবো না, আমার মাথা ব্যাথা করছে।
জানালা দিয়ে দেখছে পৌলমী। নিচের ফাঁকা লনটা বেশ সাজানো হয়েছে। একটা ব্লুইস ব্লেজারে রক্তিমকে দারুন লাগছে। নীলাঞ্জনাও বেশ সুন্দর একটা গাউন পরেছে। রক্তিম খুব হাসছে।
পৌলমীর ঘর অন্ধকার। আলো সহ্য হচ্ছে না ওর।
এতগুলো বছর ধরে রক্তিম এই মারাত্মক সত্যটা লুকিয়ে রেখেছিল ওর কাছ থেকে। দুই বাড়িতে বিয়ের কথা প্রায় পাকা। খোঁড়া মেয়ের ঠোঁট ছোঁয়াটা বোধহয় সহজ, কিন্তু তাকে বিয়ে করাটা একটু কঠিন!
অবাধ্য নোনতা জলেরা পৌলমীর গাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
রক্তিম বার দুই পৌলমীর অন্ধকার ঘরের দিকে তাকালো। আজ নীলাঞ্জনা একটু বেশিই কথা বলছে রক্তিমের সাথে।
পৌলমীর মনে পড়ে যাচ্ছে সেই প্রথম দিনের বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতি।
বার দুয়েক বেজে উঠলো পৌলমীর মুঠোফোন। রক্তিম করছে। ইচ্ছে করছে না কলটা রিসিভ করতে।
কি হলো, তুমি কাল পার্টিতে গেলে না কেন?
পিছন পিছন হাঁটছে রক্তিম। রাস্তার ফুট পথ ধরে নিজের অসমর্থ পাকে টেনে নিয়ে চলেছে পৌলমী।
যখন কাকলি কাকিমার কাছে শুনলাম তোমার আর নীলাঞ্জনার বিয়েটা বহুদিন ধরেই স্থির হয়ে আছে, তখন আর অবঞ্চিতের মত যেতে ইচ্ছে করলো না।
বিয়েটা তো দুই বাড়ির লোক ঠিক করেছে। আমি তো ঠিক করিনি।
ঘুরে দাঁড়িয়ে পৌলমী বললো, এতদিন বলনি কেন?
ওই জন্যই কি কমপ্লেক্সের কাউকে আমাদের রিলেশন জানাতে চাওনি?
প্রশ্নের মুখে পড়ে তোতলাচ্ছে রক্তিম।
জানাই নি কারণ, আমাদের নিজেদের এস্টাব্লিশমেন্টের প্রয়োজন ছিল।
তাছাড়া আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা কি জনে জনে জানানোর প্রয়োজন আছে পৌলমী?
পৌলমী গম্ভীর ভাবে বললো, আমার মনেহয়না আমাদের আর মেলামেশা করার প্রয়োজন আছে।
রক্তিমকে অবাক করে দিয়ে একা অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেল পৌলমী।
ছাদের ওই কর্ণারটা একই আছে, শুধু সন্ধ্যের অন্ধকার নামার সময়ে ওখানে আর কেউ দাঁড়ায় না।
মা সেদিন এসে বললো, বুঝলি পৌলমী, আজ নীলাঞ্জনার মা গয়না কিনেছে, মেয়ের বিয়ের জন্য, আমাকে দেখাচ্ছিল।
পৌলমী এখন শুধুই নীরব শ্রোতা।
হঠাৎ করে কখনো লিফটের দরজায় দেখা হয়ে যায় দুজনের। পৌলমী ভুলতে চায় বন্ধ লিফটের ভিতরের গল্পটা। রক্তিম অপ্রস্তুত মুখে পাশে সরে দাঁড়ায়।
একটা অজানা ঝড়ে ভেঙে গেছে সেই মেয়েবেলা থেকে দেখা স্বপ্নটা।
পৌলমী কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসছে।
রক্তিম দশটা -পাঁচটা জব করছে। রোজ সূর্য উঠছে, কমপ্লেক্সের সামনে বেকারির গাড়িটাও বাঁশি বাজিয়ে সকলকে ডাকছে। শুধু সকলের অলক্ষ্যে দুটো মানুষের চোখের ইশারাতেই আজ ফাঁকি।
মা ব্যাংকে জবটা পেয়ে গেলাম।
অঞ্জন বললো, আমি জানতাম তুই পারবি।
বাপি, এই ফ্ল্যাট টা বেচে অন্য কোথাও চলে গেলে কেমন হয়?
নন্দিতা বললো, কেন রে? তোর ব্যাংক তো এখান থেকে বেশ কাছেই হবে।
নিশ্চুপ পৌলমী।
কি বলবে বাবাকে ?
রোজদিন তার স্বপ্নের মৃত্যু দেখছে এই কমপ্লেক্সের ছাদের কার্নিশে, লিফটের বন্ধ ঘরে, ব্যালকনির ক্যাকটাসের চোরা ইশারায়। লনের সবুজ ঘাসের মধ্যে মৃত্যু দেখছে ওদের শৈশব প্রেমের। ওখানেই হয়তো রক্তিম সিঁদুর পরাবে নীলাঞ্জনার সিঁথিতে।
আর কল্পনা করতে পারছে না।
রক্তিমের বাইকটা থামলো গ্রাউন্ডের গ্যারেজে।
আজ পৌলমীও ফিরেছে একই সময়।
একই সাথে লিফ্ট উঠলো দুজনে। পৌলমী 5 বটন টেপার আগেই রক্তিম হাত দিয়ে গার্ড করলো সুইচ গুলো।
আজ এই লিফ্ট ততক্ষণ চলবে যতক্ষন না তুমি আমাকে ক্ষমা করছো।
দেখো পৌলমী, মা বাবা বোকার মতো কি ঠিক করেছে তুমি সেটাকে কেন গুরুত্ত্ব দিচ্ছ?
আমাদের এত বছরের ভালোবাসা কি তাহলে মিথ্যে?
পৌলমী বললো, তুমি কেন বলনি?
রক্তিম বললো, আমি এটাকে গুরুত্ব দিই নি। আমি মাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, আমি নীলাঞ্জনাকে বিয়ে করবো না।
লিফটের সুইচ ছাড়ো রক্তিম।
না, ছাড়বো না। একবার সাত তলায় উঠছে লিফ্ট একবার গ্রাউন্ডে নামছে।
আগে বলো, তুমি আমাকে বিয়ে করবে নাকি আমি ঐ ছাদের কার্নিশ থেকে লাফ দেব?
পৌলমী বললো, তুমি উঁচু থেকে তাকাতেই ভয় পাও। তুমি আবার লাফ দেবে কি করে?
রক্তিম বললো, তুমি জানোনা ভালোবাসায় মানুষ সব করতে পারে।
প্লিজ রক্তিম লিফ্ট বন্ধ কর। বাইরে চিৎকার হচ্ছে।
হঠাৎ করেই লিফ্টটা থেমে গেলো থার্ড ফ্লোরে এসে। সম্ভবত ইচ্ছে করেই পাওয়ার অফ করে বন্ধ করানো হলো। প্রায় আধ ঘন্টায় প্রচুর লোক জমেছে। লিফটের দরজা খুলতেই সকলের চিৎকার।
রক্তিম বললো, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আমরা ভিতরে আটকে গিয়েছিলাম।
রিক্তা আন্টি বললো, তুই এতক্ষন ভিতরে, তো ফোন করিস নি কেন?
তোর বাবাকে একটা কল করতে পারতিস।
না মা, আমি ভাবছিলাম ঠিক হয়ে যাবে।
রিক্তা আন্টি মানে রক্তিমের মা বাঁকা চোখে তাকালো পৌলমীর দিকে।
এই মেয়েটা কি করছিল তোর সাথে ?
রক্তিম বললো, ওই মেয়েটাকে রাজি করাতেই তো এতক্ষণ লিফ্টটা চালাতে হলো।
রক্তিম কি সব বলছে সকলের সামনে ! পৌলমীর বাবা মাও উপস্থিত এখানে। কাকলি কাকিমারাও আছে।
রক্তিম বললো, আসলে মা পৌলমী আর আমার প্রেমটা হয়ে ছিল ও যখন ক্লাস টেনে পড়ে। এখন পৌলমী বলছে, ও নাকি আমাকে বিয়ে করবে না।
রিক্তা আন্টিকে আকাশ থেকে ঠেলে ফেলে দিলেও এতটা চমকাত না। ছেলের মুখে পৌলমীর নাম শুনে যতটা চমকাল।
চিরটাকাল রিক্তা আন্টি বলে এসেছে, হ্যাগো নন্দিতা তোমার ঐ খোঁড়া মেয়ের পাত্র পেলে হয়? সেই মেয়ের সাথেই নাকি প্রেম করে বসে আছে তার একমাত্র ছেলে!
রিক্তা আন্টি বললো, তুই ভাবলি কি করে ওই খোঁড়া মেয়েকে আমি আমার ঘরের বউ করবো?
মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে পৌলমীর।
এত জনের সামনে ওকে এভাবে অপমান করার অধিকার কে দিয়েছে রক্তিম কে?
নিজের মাকে তো রক্তিম ভালো করেই চেনে!
রক্তিম হাসতে হাসতে বললো, কি মুস্কিল মা, আমি তো একবারও বলিনি তোমাকে বিয়ে করতে, পৌলমী তো আমার বউ হবে। ও খোঁড়া না অন্ধ সেটা আমিই বুঝে নেব।
রিক্তা আন্টি চিৎকার করে বললো, হ্যারে পৌলমী শেষ পর্যন্ত তুই আমার ছেলেকে পাকড়াও করলি?
হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল পৌলমীর!
সে বলল, না আন্টি তোমার ছেলেই আমাকে পাকড়াও করছে। আমি সেই মেয়েবেলা থেকেই ওর মনে মিশে আছি। পারলে তোমার ছেলেকে সামলে রাখো।
রক্তিম বললো, শোনো মা .. আমি পৌলমীকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারবো না । এবার তোমরা দেখো কি করবে।
নন্দিতা আর অঞ্জন বসে আছে সোফায়। পৌলমী আরেকটা চেয়ারে। নন্দিতা বললো, রক্তিমকে আমাদের পছন্দ। কিন্তু রিক্তাদি কি মেনে নেবে?
পৌলমী বললো, সেটা রক্তিমের ভাবনা মা।
আমি তো ওকে বলিনি আমাকে বিয়ে করতেই হবে। ওই তো…
কথা শেষের আগেই বেলটা বেজে উঠলো। রিক্তা আন্টি ঝড়ের মত ঢুকলো ঘরে। পৌলমি তুই একবার চল। রক্তিম আমার সাথে ঝগড়া করে কোথায় চলে গেছে। ফোনটাও ধরছে না।
তুইই পারবি ওকে ফিরিয়ে আনতে। তুই ফোন করে বল, আমি তোদের বিয়ে মেনে নিয়েছি। ওকে ফিরতে বল। রিক্তা আন্টি মহিলা সমিতির সেক্রেটারি। সেই কিনা আজ পৌলমীর মত খোঁড়া মেয়ের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে?
রক্তিম যদি কিছু করে বসে… রিক্তা আন্টি কাঁদছে।
ফোনটা বেজে যাচ্ছে। ধরছে না রক্তিম। সবাই খুঁজতে বাইরে বেরোচ্ছে।
পৌলমী আস্তে আস্তে উঠে গেছে ছাদে। দক্ষিণ দিকের নির্দিষ্ট কোনটায় একটা চেনা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
পৌলমী বললো, কি হচ্ছে ! সবাই খুঁজছে তোমায়, নীচে চলো। আন্টি কাঁদছে।
রক্তিম বললো, অনেকদিন পর আবার আমরা ছাদে।
ওই দেখো নীহারিকা তাকিয়ে দেখছে আমাদের।
শোনো শোনো, নীহারিকা কি বলছে শোনো।
পৌলমী বললো, কি বলছে?
বলছে পৌলমী খুব মিষ্টি মেয়ে, ওকে এখুনি একটা চুমু খা রক্তিম, দেরি করিস না।
ধ্যাৎ…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s