সার্বজনীন দুর্গাপুজোর ইতিহাস

সর্বজনীন দুর্গাপুজোর ইতিহাস

পলাশীর যুদ্ধের স্মারক উৎসব আজ বাঙালীর জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে|
1757 সালের 23 জুন তারিখে পলাশীর রণাঙ্গনে ক্লাইভের হাতে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় ঘটলে সবচেয়ে যারা উল্লসিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র আর কলকাতার নবকৃষ্ণ| কোম্পানীর জয়কে তাঁরা হিন্দুর জয় বলে মনে করলেন| ধূর্ত ক্লাইভও তাঁদের সেইরকমই বোঝালেন| ক্লাইভের পরামর্শে তাঁরা পলাশীর যুদ্ধের বিজয়-উৎসব করার আয়োজন করলেন| বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে তাঁরা পিছিয়ে আনলেন শরতকালে| 1757 সালেই কৃষ্ণচন্দ্র এবং নবকৃষ্ণ দুজনেই লক্ষাধিক টাকা খরচ করেছিলেন| নবকৃষ্ণ টাকা পেয়েছিলেন সিরাজদ্দৌল্লার গুপ্ত কোষাগার লুঠ করে| আর কৃষ্ণচন্দ্র টাকা পেয়েছিলেন ক্লাইভের প্রত্যক্ষ কৃপায়| ক্লাইভের সুপারিশে কৃষ্ণচন্দ্রের বার্ষিক খাজনা বরাবরের জন্যে পাঁচ লক্ষ করে কমে গিয়েছিল|
আগে এদেশে বসন্তকালে চালু ছিল দুর্গাপূজা আর শরত কালে চালু ছিল নবপত্রিকা পুজো| দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মূর্তির ব্যাপার, আর নবপত্রিকাপুজোর সাথে জড়িয়ে ছিল ন’টি উদ্ভিদের ব্যাপার| 1757 সালে পলাশীর যুদ্ধের বিজয়োৎসব পালন করার জন্যে বসন্তকালের দুর্গাপুজোকে শরত কালে নিয়ে এসে নবপত্রিকাপুজোর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল| ক্লাইভ নবকৃষ্ণের বাড়িতে সপারিষদ উপস্থিত হয়ে একশো টাকা দক্ষিণা ও ঝুড়ি ঝুড়ি ফলমূল দিয়ছিলেন|
কলকাতার হিন্দু মাতব্বররা, যারা সাহেবদের নিমন্ত্রণ করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতেন তারাও জানতেন, কেবল মাটির পুতুল দেখে সাহেবরা খুশি হবেন না| তাই সাহেবদের জন্যে জ্যান্ত পুতুল আনা হতো লখনৌ, ব্রহ্মদেশ কখনও বিলেত থেকে| এদের বলা হতো বাইজী|
পুরনো কলকাতায় বাই নাচিয়ে বিখ্যাত হয়ে পড়েছিলেন নবকৃষ্ণ দেব, গোপিমোহন দেব,রাধাকান্ত দেব, রাজকৃষ্ণ দেব, প্রাণকৃষ্ণ সিংহ, কেষ্টচন্দ্র মিত্র, রামহরি ঠাকুর, বারাণসী ঘোষ, দর্পনারায়ণ ঠাকুর, সুখময় রায়, কিষণচন্দ্র রায়, রামচন্দ্র রায়, রূপচাঁদ রায়, মদনমোহন দত্ত, বৈষ্ণবচরণ শেঠ, রূপলাল মল্লিক, দ্বারকানাথ ঠাকুর,রামদুলাল সরকার, প্রাণকৃষ্ণ হালদার এবং মতিলাল শীল|
সর্বজনীন দুর্গোৎসব
সেকালের কলকাতার বাবুদের বাড়িতে দুর্গাঠাকুর দেখার অধিকার আর সুযোগ সবার ছিল না| কেবল অতিথিরা সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন|
দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকতো বাড়ির গেটে , হাতে চাবুক নিয়ে | অতিথি ছাড়া আর কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই দারোয়ান তাকে চাবুক মারতো| ফলে ঠাকুর দেখতে গিয়ে চাবুক খেয়ে ফিরে আসতে হোত গরিব-দুখীদের|
প্রথমে বাড়ির পুজো, তারপর বারোয়ারি পুজো আর সবশেষে এসেছে সর্বজনীন পুজো|
বারো ইয়ার বা বারোজন বন্ধুর চাঁদার টাকায় প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয় 1790 সালে, হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়|
সর্বজনীন দুর্গাপুজোর পত্তন হয় এই কলকাতায়, 1926 সালে| সিমলা আর বাগবাজারে দু জায়গায় এ বছর সর্বজনীন দুর্গাপুজো হয়| সিমলা ব্যায়াম সমিতির অতীন্দ্রনাথ বোস ছিলেন প্রথমটির উদ্যোক্তা| বাগবাজারের বারোয়ারি পুজো শুরু হয় 1918 সালে| স্থানীয় কিছু যুবক এক ধনীলোকের বাড়িতে দুর্গা ঠাকুর দেখতে গিয়ে অপমানিত হন| পরের বছর তাঁরা বারোয়ারি পুজো চালু করেন| সবার জন্যে তাঁরা উন্মুক্ত করে দেন পুজোমন্ডপের দ্বার| এই পুজোর উদ্যোক্তা ছিলেন রামকালী মুখার্জি,দীনেন চ্যাটার্জী,নীলমনি ঘোষ, বটুক বিহারী চ্যাটার্জী প্রমুখ| সঠিক অর্থে এই পুজোই কলকাতার প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজো|
প্রথম সর্বজনীন পুজোয় বাধা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন অনেক রক্ষণশীল পন্ডিত| শেষ পর্যন্ত তাঁরা সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন পণ্ডিত দীননাথ ভট্টাচার্য্যের হস্তক্ষেপে|

বইয়ের হাট থেকে পাওয়া রাধারমণ রায়ের ‘কলকাতা বিচিত্রা ‘ বই থেকে সর্বজনীন দুর্গাপুজো নিয়ে লেখা থেকে নিয়ে কেটে ছেটে এখানে দিলাম|
Collected

Nizam of Hyderabad, India

মিতব‍্যায়ি নিজাম পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ! কিন্তু তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দান করে গেছেন ,,,,,,সেনাবাহিনীকে দিয়েছিলেন পাঁচ টন সোনা।

তিনি সবচেয়ে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন। কিনতেন কম, তাঁর কাছে আসা অতিথিদের থেকেই চেয়ে খেতেন বেশি। নিজের জামা কাপড় ছিঁড়লে নিজের হাতে সেলাই করতেন। দর্জিও পয়সা পেত না। তাঁর পরা পোশাক অল্টার করে আবার পরতে হতো বাড়ির কিশোরদের। ছিঁড়ে বা ফেটে না গেলে নতুন জামা বা জুতো বাড়িতে ঢুকতো না। তাঁর মতো কৃপণ মানুষ, তাঁর আশপাশের কেউ দেখেননি। রাস্তায় বেরিয়ে দোকানে খাবার খেয়ে দাম নিয়ে দোকানদারের সঙ্গে ঝগড়া করতেন। তাঁর আর্দালিদের কেউ কোনও দিন এক সিকি বকশিশ পেয়েছে বলে মনে করতে পারেন না।

সেই মানুষটির টেবিলে কিন্তু পেপার ওয়েট হয়ে শোভা পেত পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম হীরে, ১৮৫ ক্যারেটের জ্যাকব ডায়মন্ড। বর্তমানে যার দাম হাজার কোটি টাকারও বেশি। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রোলস রয়েসের পঞ্চাশটিরও বেশি মডেল রাখা থাকতো তাঁর গ্যারেজে। তাঁর কাছে যত পরিমাণ মুক্ত ছিল, তাতে একটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিংপুল ভর্তি হয়ে যেত। এই মানুষটিই রানি এলিজাবেথের বিয়েতে অক্লেশে কয়েক কোটি টাকা দামি হিরের নেকলেস পাঠিয়ে দেন। যেটি আজও রানির ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ‘নিজাম নেকলেস‘ নামে বিখ্যাত।

হ্যাঁ, এই চুড়ান্ত মিতব্যয়ী লোকটিই একসময় ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক। অবিভক্ত ভারতের হায়দরাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম, স্যর মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি। রাজ্যটি পরাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য ছিল। স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডকে যুক্ত করলে যা আয়তন হয় তৎকালীন হায়দরাবাদ ও বেরার স্টেটের আয়তন ছিল তার থেকেও বেশি। নিজামের শাসনে ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ এবং ৮২,৬৯৮ বর্গ মাইল ভূখন্ড ছিল। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন-এর ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭, সংখ্যার কভারে নিজামের ছবি ছাপা হয়। নিচে ক্যাপশন ছিল, The richest man in the world.

তাঁর ক্ষয়াটে চেহারা, জামা কাপড়ের ছিরি এবং ঝুলো গোঁফ দেখে এক ঝলকে মনে হতো রাজা রাজড়ার রসুইয়ের বাবুর্চি। কিন্তু এই বেঁটে খাটো মানুষটি অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ছিলেন । নিজাম থাকাকালীন তিনিই বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ছিলেন। ফরচুন পত্রিকা ১৯৪০ দশকে তাঁর সম্পত্তির মূল্য ধরে দুই বিলিয়ন ইউএস ডলার। বর্তমানে যার মূল্য দাঁড়াতো কম করে ধরলেও প্রায় চার বিলিয়ন ইউএস ডলার। টাকার মূল্যে প্রায় ২৯৭৪৫ কোটি টাকা। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তো ছিলেনই , ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ অবধি তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি হিসেবে ধরা হতো, ১৯৬৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

ব্রিটিশ ভারতে স্বাধীন হায়দরাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম, স্যার মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকিরাজ্যটি শাসন করেছেন ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। রাজ্যটিকে রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ভারতে বা পাকিস্তানের অধীনে রাজ্যটিকে নিয়ে যেতে চাননি। চেয়েছিলেন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গেই জন্ম নিক তৃতীয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। চৌধুরী রহমত আলি যার নাম দিয়েছিলেন ‘উসমানিস্তান‘। কিন্তু ভারত সরকার নিজামের এই সিদ্ধান্ত পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু নাছোড়বান্দা নিজামও। অবশেষে আলোচনার টেবিলে বিফল হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ আক্রমণ করে। মেজর জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরীর অধীনে এক ডিভিশন ভারতীয় সেনা ও একটি ট্যাঙ্ক ব্রিগেড হায়দরাবাদে আক্রমণ চালায়। আক্রমণের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন পোলো’।

নিজামের পাঁচ হাজার সেনার পক্ষে ভারতের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর স্থল ও আকাশ পথে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। তাই কয়েক ঘণ্টায় হার মানলেন নিজাম। তাঁর হায়দরাবাদ ও বেরার স্টেট ভারতের মানচিত্রে প্রবেশ করল। ভারতে অন্তর্ভুক্তির পর ১৯৫০ সালের ২৫শে জানুয়ারি নিজাম মীর উসমান আলিকে হায়দরাবাদ স্টেটের রাজপ্রমুখ পদে অভিষিক্ত করা হয়। সেই পদে তিনি ৩১শে অক্টোবর ১৯৫৬ পর্যন্ত থাকেন। আপনার মনে হতে পারে , সাতটি স্ত্রী , চৌত্রিশটা ছেলেপুলে এবং অগনিত রক্ষিতা নিয়ে জীবন কাটানো নিজাম আদৌ সুবিধের লোক ছিলেন না। ভারত বিরোধী ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে হিন্দু বিদ্বেষী একজন কট্টর মুসলিম শাসক ও শোষক হিসেবে দেখিয়েছেন। যদিও ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য তৈরি হওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর রাজ্যকে যুক্ত করেননি।

তাহলে এবার জেনে নিন , এই মানুষটি, নিজাম মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি ভারতের জন্য কী করে গেছেন। সবার অপছন্দের নিজাম বাহাদুর ভারতের জন্য যেটা করে গেছেন, তা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেননি। পারবেনও না। তখন ১৯৬৫ সাল, ভারতকে চোখ রাঙাচ্ছে চিন। সঙ্গে পেয়েছে দোসর পাকিস্তানকে। দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ভারত তৈরি করল জাতীয় নিরাপত্তা তহবিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হায়দরাবাদে গেলেন। নিজামকে অনুরোধ করলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে নিজামকে কিছু দান করার জন্য। সব শুনলেন কৃপণ নিজাম। মিটি মিটি হাসতে হাসতে নিজের সেক্রেটারিকে ডাকলেন। একটা কাগজে উর্দুতে কী একটা লিখে দিলেন। সেক্রেটারি কাগজটা তুলে চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিলেন। ভারতের নিরাপত্তা তহবিলে নিজাম ওসমান আলি দিলেন ডোনেশন। চমকে গেল বিশ্ব। সামান্যই দিলেন। মাত্র পাঁচ টন সোনা। এর সঙ্গে নগদে দিলেন ৭৫ লক্ষ টাকা।

১৯৬৫ সালে নিজামের দেওয়া ৫০০০ কেজি সোনা এখনও পর্যন্ত ভারতের জাতীয় কোষাগারে দান হিসাবে দেওয়া সবচেয়ে বড় অর্থরাশি। এতো টাটা, বিড়লা, অম্বানী, আদানি, মিত্তাল এলেন ও গেলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি তো বটেই কোনও প্রতিষ্ঠানও এতো পরিমাণ সম্পদ ভারতের সুরক্ষা খাতে দান করার বুকের পাটা দেখাতে পারেননি।

এই মানুষটি তাঁর প্রিন্সলি স্টেটের বাজেটের ১১%শিক্ষা খাতে ব্যয় করতেন। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল এবং গরীবদের জন্য নিখরচায় শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিনি বিশাল অঙ্কের টাকা অনুদান হিসেবে পাঠাতেন। এর মধ্যে জামিয়া নিজামিয়া, দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, এমনকি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিও ছিল। তাঁর তৈরি করা ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ ইউনিভার্সিটি। প্রচুর স্কুল, কলেজ, অনুবাদ কেন্দ্র নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন নিজাম।

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিকে ডোনেশন দেওয়া নিয়ে একটি মজার গল্প আছে। এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে নিজাম শীতে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর আর্দালিকে কম্বল কিনে আনতে বলেন। হিসেবি নিজাম বলে দিলেন কম্বলের দাম ২৫ টাকার বেশি হওয়া চলবে না। তাঁর আর্দালি ২৫ টাকার কম্বল না পেয়ে ফিরে এলেন। কারণ কম্বলের দাম ৩৫ টাকা। যাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ শুনলে ভির্মি খান রাজারাজড়ারা, সেই নিজাম বাহাদুর আর্দালির মুখে কম্বলের দাম শুনে পুরোনো কম্বল গায়েই ঘুমিয়ে পড়লেন। কয়েক ঘন্টা পরে, সকালে উঠেই তিনি বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিকানীরের মহারাজার একটি অনুরোধ পেলেন। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে হিন্দু ছাত্রদের জন্য কিছু সাহায্যের অনুরোধ। একটুও না ভেবে, এক লাখ টাকা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পাঠিয়ে দিলেন সেই মানুষটি। যিনি গতরাত্রে দশটাকা দাম বেশি হওয়ায় একটি কম্বল কেনেননি।

নিজাম ওসমান গনি ভারতের তৎকালীন সব রাজা মহারাজাদের চেয়ে সব বিষয়েই এগিয়ে ছিলেন। আজ দিল্লিতে যে ঐতিহ্যশালী হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন, এই প্যালেসটি কিন্তু নিজামের অর্থে বানানো। তাঁর জমানায় তিনি হায়দরাবাদ শহরে তৈরি করেছিলেন তাক লাগানো কিছু প্রাসাদ। যেমন ওসমানিয়া হসপিটাল, হায়দরাবাদ হাইকোর্ট, আসাফিয়া লাইব্রেরি (যেটি এখন পরিচিত স্টেট জেনারেল লাইব্রেরি নামে), টাউন হল (এখন অ্যাসেম্বলি হল নামে পরিচিত), জুবিলী হল, হায়দরাবাদ মিউজিয়াম( বর্তমানে যেটি স্টেট মিউজিয়াম), নিজামিয়া অবজারভেটরি সহ অগনিত প্রাসাদ ও মনুমেন্ট।

তৎকালিন হায়দরাবাদ স্টেটের মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে গবেষণার হাতে খড়ি নিজামের হাতেই হয়েছিল। ১৯১৮ সালে পারভানিতে প্রথম পরীক্ষামূলক ফার্ম গড়ে তোলেন নিজাম। ১৯৪১ সালে তিনি নিজেই নিজের ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন হায়দরাবাদ স্টেট ব্যাঙ্ক। বর্তমানে যার নাম স্টেট ব্যাঙ্ক অফ হায়দরাবাদ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হায়দরাবাদই ছিল একমাত্র স্টেট যাকে ব্রিটিশরা নিজস্ব কারেন্সি নোট ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। নিজামের মুদ্রার নাম ছিল, ‘ ওসমানিয়া সিক্কা‘। নোটের নামে ছিল, ‘হায়দ্রাবাদি রুপি‘। নিজামের বিমানের শখও ছিল। তিনি ১৯৩০ সালে ‘হায়দরাবাদ এরো ক্লাব’ এবং বেগমপেট এয়ারপোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ব্যবসায়িক এয়ারলাইন্স নিজামের ডেকান এয়ারওয়েজ- এর ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট গুলি।

পাঠক , এবার কি আপনার মনে হচ্ছে না, নিজাম মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি নামক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে সঞ্চয়ী লোকটি হচ্ছেন একাধারে কুবের ও বিশ্বকর্মা! লেখা শেষের আগে বিশ্বের ধনীতম মানুষটির সম্পর্কে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনী শুনে নিন। ভারতীয় নিরাপত্তা তহবিলে দেওয়ার ৫ টন স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি ট্রাঙ্কগুলি যখন ভ্যানে লোড করা হচ্ছে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো নিজাম ভুরু কুঁচকে তাঁর নিজস্ব অফিসারদের বলেছিলেন, ” আমি কিন্তু পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রাই শুধু দান করেছি। ট্রাঙ্ক গুলো নয়। তাই ওগুলো যেন আমার কাছে ফেরত আসে খেয়াল রেখ”।
Collected

তিস্তা একটি মেয়ের নাম

ছোটগল্প
তিস্তা একটি মেয়ের নাম
আজিজ আহমেদ
১ জুলাই ২০১৮ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবি: বৈশালী সরকার
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে পড়ে মেথিবাড়ি। সুকনা মিলিটারি ক্যাম্পের কিছুটা আগে সেই জায়গা। ওই পুরো এলাকাটা আমার চেনা ছিল। কিন্তু সে তো অনেক বছর আগে। প্রায় দশ বছর পার হয়ে গিয়েছে। তবুও গতকাল সন্ধে থেকে একটা দমকা হাওয়া আমার স্মৃতির দরজায় এসে বারবার আছড়ে পড়ছে। মনে রাখার মতো তো কিছুই ছিল না। তবুও সব কিছু চোখের সামনে ভাসছে মেয়েটিকে দেখার পর থেকে। বারবার মনে হচ্ছিল, আমার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো, সত্যিই কি এই সেই মেয়েটি?

রাতে ভাল করে ঘুমাতে পারিনি। এত ভোরে উঠি না কোনওদিন। আজ রবিবার। বাবা-মার সঙ্গে আমার মেয়েও ঘুমোচ্ছে। ঘুমাক আর একটু। শান্ত সকালের মৃদু ঠান্ডা হাওয়া এই বারান্দায় মনকে আরও বেশি অশান্ত করে তুলছে কেন জানি না। কাগজের খবরে মন নেই। কফিটাও একটু বেশি তেতো লাগছে। কাল সন্ধেবেলা আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলবিন্দর ফোন করে বলেছিল, ‘‘স্যর কাজটা হয়ে গেছে। যদি পারেন তো একবার এসে দেখে যান।’’

গিয়েছিলাম কর্নাটপ্লেস পুলিশ স্টেশনে। বাকিদের ভিড় ছাপিয়ে এক গভীর দৃষ্টিতে দেখছিল মেয়েটি আমাকে। হয়তো বোধহয় চেনার চেষ্টা করছিল আমাকে। আমি কথা বলিনি। অন্য কেসের ফাইলে ব্যস্ত করে নিয়েছিলাম নিজেকে। কিন্তু এখন তো কোনও ব্যস্ততা নেই। তবে সেই মুখটা কেন এত অস্থিরতা ছড়াচ্ছে আমার মধ্যে।

–– ADVERTISEMENT ––

আর্মিতে চাকরি পাওয়ার পরের বছরই বদলি হয়ে গেলাম উত্তরবঙ্গে। দার্জিলিং যাওয়ার পথে পড়ে সুকনা মিলিট্যারি ক্যাম্প। থাকতাম সেখানে। বছর দশেক আগে, তখন আমার, সাতাশ-আঠাশ বছর বয়স। দিল্লিতে মানুষ হয়েছি, তাই বোধ হয় জায়গাটা বেশ ভাল লেগে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, অন্য জায়গার চেয়ে বেশ আলাদা। দূরে পাহাড়, পিছনে সুকনা ফরেস্ট আর চায়ের বাগান, সামনের রাস্তা দিয়ে দিনে দু’বার টয়ট্রেনের কু-ঝিকঝিক… অসাধারণ দৃশ্য। প্রতিদিন বিকেলে সহকর্মীর সঙ্গে টয়ট্রেনের লাইন ধরে হেঁটে বেড়াতাম। কিছুটা দূরে মেথিবাড়ির লোকালয়ে একটা দোকানে প্রায় চা আর মোমো খেতে যেতাম।

রাস্তার উপর রেল লাইনের পাশেই ছিল দোকানটা। সুস্বাদু মোমো পাওয়া যেত, তার সঙ্গে চা। ময়দার আবরণের ভিতর স্কোয়াশ কিংবা চিকেনের পুর দেওয়া মোমো এখন তো সব জায়গায় পাওয়া যায়। কিন্তু আমি তখন খেয়েছিলাম জীবনে প্রথম বার। কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা আর পুদিনার চাটনির সঙ্গে। সেই স্বাদ যেন এখনও জিভে লেগে আছে। তবে ওই দোকানে প্রতিদিন যাওয়ার পিছনে আরও একটা কারণ ছিল। তা হল, নেপালি বুড়ো দোকানদারের মেয়েটি। বাবা আর মেয়ে মিলে দোকানটা চালাত। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। বয়স আঠেরো-ঊনিশের মধ্যে। মেয়েটির কিন্তু পুরোপুরি নেপালিদের মতো দেখতে ছিল না। বাবা নেপালি হলেও মা হয়তো বাঙালি ছিল। বাংলা এবং নেপালি দুটো ভাষাতেই কথা বলতো মেয়েটি। কাঠের তৈরি দোকানটার ভিতরে কয়েকটা বেঞ্চ আর প্লাস্টিকের টেবিল ছিল। অর্ডার দিলে মেয়েটিই খাবার নিয়ে আসত। আমরা কয়েকজন ওদের রোজকার খদ্দের ছিলাম। মোমো আর চা খেতে খেতে গল্পে গল্পে অনেকটা সময় ওখানে চলে যেত। মেয়েটি আমাদের ডাকত মিলিটারিবাবু নামে। এমন করে কাটছিল দিনের পর দিন। বলতে বাধা নেই, অদ্ভুত এক আকর্ষণ অনুভব করতাম ওই দোকানটার প্রতি। ওই মেয়েটিকে আমার বেশ ভাল লাগত। মেয়েটির মধ্যে কোনও জড়তা ছিল না। সকলের সঙ্গে হেসে কথা বলত। যাকে বলে মিষ্টি স্বভাবের ছিল সে। শুনেছি পড়াশোনাও জানত কিছুটা। বুড়োর স্ত্রী ঘরের ভিতরই থাকত। অসুস্থ ছিল সে। বুড়োর আর একটি মেয়ে ছিল। ওই মেয়েটির চেয়ে ছোট। পুরো সংসারের হাল এক অর্থে মেয়েটিকেই ধরতে হয়েছিল দোকানটা চালিয়ে। পরে জানতে পেরেছিলাম ওই দোকানে যত নেপালি ছেলে-ছোকরাদের ভিড় তা ওই মেয়েটির জন্য। দেখতাম, আমার তিনটে মোমো খাওয়া হলে ও আবার আমার প্লেটে চাটনি দিয়ে যেত। ও লক্ষ করেছিল, তিনটে মোমো খাওয়ার পর আমার প্লেটে চাটনি খতম হয়ে যায়। প্লেটে আবার চাটনি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসত। ওই হাসিটা প্রতিবারই ভাল লাগত। আমাদের মধ্যে কথা হত, তবে বেশ কম। এক জন দোকানির সঙ্গে খুব বেশি আর কী কথা হতে পারে। খুব শান্ত দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকাতো, আর সেই দৃষ্টির ভাষা বোঝার জন্য আমিও ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ফলাফল যদিও শূন্য ছিল। ব্যাপারটা সহকর্মীদের নজর এড়িয়ে যেত না। ক্যাম্পে ফিরে আসার পর তারা কথার ছলে মেয়েটির কথা তুলে আমাকে নিয়ে মজা করত। আমি গুরুত্ব না দিয়ে চলে যেতাম। ব্যস ওখানেই গল্প শেষ হয়ে যেত।

দেড় বছর পর বদলি হয়ে গেলাল জম্মুতে। যত দূর মনে পড়ে শেষ দিন এক বার গিয়েছিলাম ওই দোকানে। জানি না কিসের টানে। হয়তো মেয়েটিকে একবার দেখার জন্য। দেখে ফিরে এসেছিলাম। বলে আসিনি যে, তোমার দোকানে মোমো খেতে আমি আর আসব না। বলে আসার প্রয়োজন বোধও করিনি। মেয়েটির নামও আমার জানা হয়নি।

তার পর সময়ের পিঠে চড়ে পার করেছি অনেকগুলো বছর। কখনও সময় চড়েছে আমার পিঠে। ঠিক সময়ে বিয়ে করেছিলাম। ঠিক সময়ে বাবাও হয়েছিলাম। দিল্লিতে বাবা মার সঙ্গে স্ত্রী আর মেয়েকে রেখে পড়ে থাকতাম জম্মুতে। ওদের জন্য মন কেমন করত। তার পর ভগবান এক দিন হঠাৎ স্ত্রীকে ডেকে নিলেন নিজের কাছে। মেয়ের বয়স তখন বছর চার। স্ত্রীর অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারিনি। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বাবা-মা আর মেয়ের কাছে ফিরে এসেছিলাম সেনাবাহিনীর চাকরিতে ইতি টেনে।

মেয়েকে আগলে-আগলে রাখতাম। তখন আমিই ওর মা আমিই ওর বাবা। এ ভাবেই কয়েকটা বছর পার হল। মেয়ে বড় হল। আস্তে আস্তে একা হলাম। বোরড হতাম ঘরে বসে বসে। পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চাকরিও জুটিয়ে ফেললাম একটা। স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ, দিল্লি পুলিশ। আর সেই সূত্রেই এই এত বছর পর আবার সেই মেথিবাড়িতে। কাল সন্ধেবেলা পুলিশ স্টেশনে হঠাৎ সেই মোমোর দোকানের মেয়েটিকে দেখে মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের ঝড় উঠছে।

মোবাইলটা বেজে উঠল। তাকিয়ে দেখলাম সকাল ভালই হয়েছে। মেয়ে আজ দাদুর
সঙ্গে সকালে হাঁটতে বেড়িয়েছে। ফোনটা ছিল বলবিন্দরের। ‘‘হ্যালো’’ বলতেই বলবিন্দর বেশ উদ্বিগ্নতার সঙ্গে বলল, ‘‘গুডমনিং স্যর। একটা খারাপ খবর আছে। কাল কমলা মার্কেটের সেক্স র‌্যাকেট থেকে যে মেয়েগুলোকে আমরা অ্যারেস্ট করেছিলাম তাদের মধ্যে এক জন রাতে আত্মহত্যা করেছে। হাতের শিরা কেটেছে। একটা নোটও আছে। বাঁচার সম্ভবনা কম। আমরা হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আপনি একবার আসবেন প্লিজ?’’

জানি না কেন আমি হাসপাতালে না গিয়ে পুলিশ স্টেশনে গেলাম। হয়তো নোটটা দেখার জন্য। বুকের মধ্যে একটা অস্বস্তি আনচান করছিল। জানার জন্য মন ছটফট করছিল, ওদের মধ্যে কোন মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে? আমার মন বলছিল মোমো-দোকানি। অনুমান সত্যি হল। বলবিন্দরের কাছ থেকে সুইসাইড নোটটা নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়তে পারছিলাম না। মাথার মধ্যে, বুকের মধ্যে এক অস্থিরতায় আমি স্বাভাবিক থাকতে পারছিলাম না। আমার আগে বাকিরা কি সবাই এ নোট পড়ে ফেলেছে! জানার প্রয়োজন ছিল না। আমার কথা মতো ড্রাইভার এখন বেশ জোরেই গাড়ি চালাচ্ছে। আমি চলেছি হাসপাতালে। মেয়েটির সঙ্গে এক বার অন্তত কথা বলতে চাই। গাড়িতে বসে চিঠিটা আবার পড়ার চেষ্টা করলাম।

******

মিলিটারি বাবু,

আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। কিন্তু আমি আপনাকে চিনেছি। আসলে আমি তো আপনাকে ভুলিইনি কোনওদিন। এত বছর পর এই ভাবে আপনাকে দেখতে পাব ভাবতে পারিনি। আমি একটা বোকা মেয়ে। কোথায় আমি আর কোথায় আপনি। তবুও প্রতিদিন বিকেলে অপেক্ষা করেছি আপনার জন্য। বুঝতে পারিনি, আমাকে দেখার জন্য আপনি আর কোনওদিনই দোকানে আসবেন না। আপনাকে খুব ভাল লাগতো আমার। ভালবেসে ফেলেছিলাম আমি। সে কথা বলতে পারিনি কাউকে। আপনাকে তো নয়ই।

শীতের রাতে এক দিন বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল কয়েকজন। রেপ করে চা বাগানের মধ্যে ফেলে রেখে গিয়েছিল। চিনতে পেরেছিলাম দলের পান্ডা শয়তানটাকে। রাজু ছেত্রি। আমাদের পাড়ার ছেলে। সবার কাছে বাবার নাম খারাপ হল। জোয়ান মেয়েকে দোকানে বসিয়ে বাবা ধান্দা করছে এমন অপবাদও জুটল। গ্রামের লোকেরা বাবাকে মারধোর করে আমাদের দোকান বন্ধ করে দিল। অসুখে ভুগে ভুগে বাবাও মারা গেল। আমার বিয়ে তো দূরের কথা আমার বোনকেও বিয়ে করতে চায়নি কেউ। রাজু বলেছিল সে আমাকে বিয়ে করবে, শহরে গিয়ে চাকরি করবে, আমাদের অভাব আর থাকবে না। বিশ্বাস করেছিলাম। আমি তো বোকাই ছিলাম। দিল্লিতে নিয়ে এসে রাজু আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল। তার পর বিক্রি হয়েছি অনেক বার। পালাতে পারিনি কারণ রাজু আমার মা আর বোনকে মেরে ফেলার ভয় দেখাত। ওর চোখ এখন আমার বোনের উপর।

আপনাকে এসব কথা কেন বললাম জানি না। তবে বুকটা একটু হালকা হল। পুলিশ রাজু ছেত্রিকে অনেক দিন ধরে খুঁজছে। ওর আসল ঠিকানা কেউ জানে না। জি বি রোডের আটষট্টি নম্বর বিল্ডিংএ ওকে পেয়ে যাবেন। ওকে শাস্তি দেবেন দয়া করে। আমার বোন ও বোনের মতো আরও অনেক মেয়েদের জীবন প্রতি দিন নষ্ট করে চলেছে রাজুদের মতো লোকেরা। ভবিষ্যতেও করবে। আমার জীবনের আর কোনও মূল্য নেই। রাজু ধরা পড়লে কিছুটা মূল্য পাবে এই জীবন। আমার এই নোংরা মুখ নিয়ে আপনার জেরার সাম্মুখীন হতে পারব না। আমার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করছি না। আপনি ভাল থাকবেন মিলিটারিবাবু।

ইতি

মোমো দোকানি।

******

‘‘স্যর আমরা পৌঁছে গেছি…স্যর..স্যর…’’ ড্রাইভারের ডাকে সম্বিত ফিরল আমার। গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে ঢুকলাম হাসপাতালের ভিতর। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। আমার পরিচয় দিলাম। মেয়েটির অবস্থার কথা জানলাম। অনেক রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে। তবুও ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। অনেক শক্তি সঞ্চয় করে ধীর পায়ে মেয়েটির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। কাঁচের ভিতর দিয়ে ডাক্তার আর নার্সরা ওকে ঘিরে আছে। হয়তো শেষ চেষ্টা চলছে। ভিতরে ঢোকার অনুমতি না নিয়েই গিয়ে দাঁড়ালাম মেয়েটির সামনে। সেই চেনা মুখ। সেই চেনা চোখ। তবু যেন সব কিছু অচেনা লাগছে। এক মলিন দৃষ্টিতে মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এত ক্ষণ বোধ হয় ও আমারই জন্য বেঁচে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে খুব ধীর গলায় বলার চেষ্টা করল, ‘‘মিলিটারি বাবু…’’

ডাক্তার আমাকে বাইরে চলে যেতে বলছিলেন। আমি গেলাম না। মেয়েটির কপালে আলতো করে হাত রেখে, মুখটা কাছে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমার নাম কি?’’ একটা ক্ষীণ হাসির চেষ্টা, তার পর উত্তর,‘‘আমার নাম তিস্তা।’’

জীবনে প্রথমবার নিজের চোখের সামনে কাউকে চিরতরে চলে যেতে দেখলাম। জীবনে প্রথম বার একটি মেয়ের জন্য নিজের চোখে তিস্তা বইতে দেখলাম।

শ্রীখণ্ডের গোপীনাথ

।।শ্রীখণ্ডের গোপীনাথ।।

নবদ্বীপের কাছে শ্রীখণ্ড বলে একটা জায়গা আছে। অতি প্রাচীন অখ্যাত একটা গ্রাম। আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগেকার কথা। মহাপ্রভুর প্রায় সমসাময়িক। সেই গ্রামের তৎকালীন বিখ্যাত কবিরাজ ছিলেন মুকুন্দ রায়। তিনি ছিলেন একজন সদাচারী ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব। বাড়িতে তার প্রতিষ্ঠিত গৃহদেবতা কষ্টিপাথরের গোপীনাথ। প্রতিদিন ভোরে উঠে মুকুন্দ কবিরাজ স্নান সেরে গোপীনাথের সেবা পুজো সেরে তারপর রুগী দেখতে বসতেন। আর ঈশ্বরের কৃপায় কবিরাজ মশাইএর অদ্ভুত হাতযশ ছিল। প্রায় সমস্ত রোগীই তার ওষুধ সেবন করে ভাল হয়ে যেত।
এইরকম একদিন মুকুন্দ কবিরাজ স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকেছেন , এমন সময় একটি বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে ছুটতে ছুটতে এসে আকুল স্বরে ডাকছে, কোবরেজ মশাই, ও কোবরেজ মশাই ……..”
মুকুন্দ কবিরাজ ঠাকুর ঘর থেকে বের হয়ে ছেলেটিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কে বাবা তুমি? কি হয়েছে?”
ছেলেটি বলল, “কোবরেজ মশাই, আমি পাশের গাঁয়ে থাকি। আমার নাম গুরুচরণ। আমার বাবার খুব জ্বর। আপনি এক্ষুনি চলুন।”
কবিরাজ মশাই বললেন, “তা কি করে হয় বাবা। সবে আমি আমার গোপীনাথের চরণে তুলসী দিয়েছি মাত্র। একটু দাঁড়াও, প্রভুকে সেবা দিয়েই আমি যাব।”
ছেলেটা আকুল স্বরে বলল, “না কোবরেজ মশাই। অত দেরী করলে বাবাকে বাঁচানো যাবে না। গোপীনাথ পরেও সেবা নিতে পারবেন। আপনি দয়া করে এক্ষুণি চলুন। আপনার দুটি পায়ে পড়ি কোবরেজ মশাই ……।”
ছেলেটার আকুতি দেখে কবিরাজ মশাইএর খুব মায়া হল। উপায়ান্তর না দেখে মুকুন্দ কবিরাজ তার নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকে হাঁক পাড়লেন, ” রঘুনাথ! ও রঘুনাথ ”
ঘরের ভেতর থেকে ছোট্ট রঘুনাথ বেরিয়ে এল। কবিরাজ মশাই বললেন, “বাবা রঘু! আমি এই ছেলেটির সাথে পাশের গাঁয়ে যাচ্ছি, ফিরতে দেরী হতে পারে। তুই বাবা স্নান সেরে গোপীনাথের সেবাটা দিয়ে দিস।”
রঘুনাথ তো মহা খুশি। এই প্রথম গোপীনাথের সেবার সুযোগ পেয়েছে। আনন্দে আটখানা হয়ে বাবাকে বলছে, তুমি নিশ্চিন্ত মনে যাও বাবা। গোপীনাথকে আমি আজ সেবা দেব। কবিরাজ মশাই চলে গেলেন।
রঘুনাথ তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ধুতি পড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলছে, “মা বাবা আজ আমায় গোপীনাথের সেবা দিতে বলে গেছেন। তুমি তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে দাও।”
মা বললেন, “এই ত বাবা, এখুনি দিচ্ছি।” –এই বলে কাঁসার থালায় করে বেশ কিছু নাড়ু এনে রঘুনাথের হাতে দিয়ে বললেন, “ভাল করে গোপীনাথকে সেবা দিবি। তিনি যেন গ্রহণ করেন।”
সরল বাচ্চা ছেলে ভাবলে গোপীনাথ বোধহয় সত্যি সত্যিই খান। যাই হোক ঠাকুর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গোপীনাথকে থালাটা এগিয়ে দিয়ে বলছে, “দেখ গোপীনাথ! আজ মা তোমায় নাড়ু দিয়েছে। জান তো গোপীনাথ! মা কিন্তু গেল হপ্তায় এগুলো নিজে হাতে বানিয়েছে, আমি দেখেছি। নাও আর দেরী কোর না। জানি খুব ক্ষিদে পেয়েছে তোমার। নাও শিগগির খেয়ে নাও ত দেখি।”
কিন্তু কই? গোপীনাথ ত খাচ্ছে না!
“ওওও …. বুঝেছি। তোমায় বাবার মত চন্দন দিইনি বলে খাচ্ছ না? আচ্ছা বেশ। এই নাও তোমায় চন্দন পরিয়ে দিচ্ছি।”
চন্দন পরিয়ে আবার বলছে, “নাও গোপীনাথ! নাড়ু খাও।”
তবুও গোপীনাথ খাচ্ছেনা!
“ওওও বুঝেছি, বাবা তোমায় বাতাস করে। তাই না? দাঁড়াও।”
এই বলে গোপীনাথকে পাখা দিয়ে বাতাস করছে আর বলছে, “নাও গোপীনাথ এবার খাও।”
না তো, এখনও তো গোপীনাথ খাচ্ছেনা!

এভাবেই চলছে অনুনয় বিনয়। কিন্তু গোপীনাথের কোন সারা নেই। অবশেষে অধৈর্য হয়ে বালক রঘুনাথ বলছে, ” ও আমি দিচ্ছি বলে খাচ্ছ না? খেতে হবেনা তোমার। এই আমি তোমার চরণে মাথা কুটে মরব। এই বলে অভিমানী রঘুনাথ গোপীনাথের চরণে মাথা ঠুকতে শুরু করল। ঠুকতে ঠুকতে ছোট্ট শরীরের নরম চামড়া কেটে গিয়ে রক্ত পরতে শুরু করেছে। হঠাত্ এক চোখধাঁধানো জ্যোতিতে ঠাকুর ঘর আলোকিত। কষ্টিপাথরের গোপীনাথের ভেতর থেকে দুটি অপ্রাকৃত হাত বেড়িয়ে এল , ” কই রে রঘুনাথ! নাড়ু দে ….”

নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না রঘুনাথ। নির্বাক হয়ে বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে আছে রঘুনাথ চিন্ময় গোপীনাথের ভুবন মোহন রূপের দিকে। আহা! কি রূপ!!!
“কি হল রঘু! নাড়ু দিবিনা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ”, সম্বিত ফিরে পেল রঘুনাথ। “গোপীনাথ! তুমি এসেছ ! আঃ, কি সুন্দর দেখতে তুমি। নাও এই নাও,” বলে একটা নাড়ু গোপীনাথের সামনে ধরল। গোপীনাথ হাত বাড়িয়ে নাড়ুটি গ্রহণ করলেন।
“নাও আর একটা খাও”–গোপীনাথ খেলেন।
“এই নাও, আর একটা।”
রঘু দিয়ে যাচ্ছে, গোপীনাথ খেয়ে যাচ্ছেন।
হটাৎ গোপীনাথ বললেন, “রঘু ! ও দুটো থাক। ও দুটো তোর জন্য।”
হুঁশ ফিরল রঘুনাথের। থালায় মাত্র দুটো নাড়ু পরে আছে। ততক্ষণে গোপীনাথ আবার সেই কষ্টিপাথরের।
এদিকে ততক্ষণে মুকুন্দ কবিরাজ ফিরে এসেছেন। ডাকছেন, রঘু! ও রঘু! কোথায় গেলি বাবা?
ঠাকুর ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল রঘুনাথ। থালায় দুটো নাড়ু। মা দেখে বলছেন, “একি রঘু! বাকি নাড়ু কোথায়?”
“গোপীনাথ খেয়েছে মা”।
“ছিঃ বাবা! গোপীনাথের নামে মিথ্যে বলতে নেই। পাপ হয়।” মুকুন্দ কবিরাজ বললেন।
“আমি মিথ্যে বলছি না বাবা। বিশ্বাস কর।” এই বলে রঘুনাথ আদ্যপান্ত ঘটনা বর্ননা করল।
সব শুনে মুকুন্দ কবিরাজ ভাবলেন ছেলে মিথ্যে বলছে। লোভে পড়ে নাড়ু খেয়ে এখন গোপীনাথের নামে মিথ্যে বলছে। কিন্তু তিনি মুখে কিছু বললেন না।
পরদিন সকালে আবার রঘুনাথকে ডাকলেন। ডেকে বললেন, “বাবা রঘু ! আমাকে একটা জরুরী কাজে বেরুতে হচ্ছে। তুই বাবা কালকের মত গোপীনাথের পুজোটা দিয়ে দিস। ক ই গো! শুনছ, রঘুকে আজকেও নাড়ু দিয়েই সেবা দেওয়াবে।”……বলে চলে গেলেন।
কিন্তু গেলেন না। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলেন। ততক্ষণে রঘুনাথ ঠাকুর ঘরে ঢুকে পড়েছে। আবার সেই সাধ্য সাধনা। বাইরে দাঁড়িয়ে চুপটি করে সব শুনছেন মুকুন্দ কবিরাজ ও রঘুর মা। হঠাত্ সব চুপচাপ। ঠাকুর ঘরে কোন সাড়া শব্দ নেই। কবিরাজ মশাই বুঝলেন, এইবার রঘুনাথ চুপ করে বসে নাড়ু খাচ্ছে। পা টিপে টিপে দরজার সামনে গেলেন কবিরাজ মশাই। এবং হটাৎ হাট করে খুলে দিলেন দরজা। বিস্ফারিত চোখে দেখলেন একটা জ্যোতি যেন হটাৎ মিলিয়ে গেল আর গোপীনাথের হাতে বাঁশীর বদলে ধরা রয়েছে একটি নাড়ুর অর্ধেকটি এবং সেটিও শীলায় পরিনত হয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে রঘুনাথ দাঁড়িয়ে আছে।
জড়িয়ে ধরলেন বাবা ছেলেকে। কাঁদতে কাঁদতে বললেন “বাবা রঘু! তুই ধন্য। ধন্য তোর ভক্তি, তোর সরল বিশ্বাস। আমি এতদিন নিয়ম নিষ্ঠাভরে প্রভুর সেবা করে যা পাইনি ,তুই শুধু তোর সরল বিশ্বাস আর প্রেমের জোড়ে তা পেয়েছিস। তোকে মিথ্যেবাদী ভেবেছিলাম। ধিক্ আমাকে ধিক্।”

আজও শ্রীখণ্ডে গোপীনাথ মন্দিরে বিরাজ করছে সেই কষ্টিপাথরের গোপীনাথ বিগ্রহ যার হাতে আজও বাঁশীর বদলে বিরাজিত পাথরের অর্ধ নাড়ু। সারা ভারতবর্ষে আর কোথাও এমন কৃষ্ণবিগ্রহ নেই!
(এটা গল্প নয়। ইতিহাস)

Pin drop silence

পিনড্রপ সাইলেন্স
————————-

পিনড্রপ সাইলেন্স (সম্পূর্ণ/চরম নিস্তব্ধতা) মানে কি? চলুন, নিচের ঘটনাগুলি পড়া যাক। প্রতিক্ষেত্রেই নীরবতা শব্দের থেকে বেশি বাঙময়।

ঘটনা ১
———–

ফিল্ড মার্শাল স্যাম বাহাদুর মানেকশ একবার গুজরাটের আহমেদাবাদে এক জনসভায় ইংরাজিতে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। জনতা দাবি তুললো গুজরাটিতে বক্তৃতা দেওয়া হোক, তবেই তারা শুনবে।

মানেকশ জনতার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন।

“আমি আমার দীর্ঘ জীবনে অনেক যুদ্ধ লড়েছি।
শিখ রেজিমেন্টের কাছে পাঞ্জাবি শিখেছি।
মারাঠা রেজিমেন্টের কাছে মারাঠি শিখেছি।
তামিল শিখেছি তামিল সৈন্যদের কাছ থেকে।
বাংলা শিখেছি বাঙালি সৈন্যদের কাছ থেকে।
বিহার রেজিমেন্ট আমাকে হিন্দি শিখতে সাহায্য করেছে।
এমনকি গুরখা রেজিমেন্টের কাছে নেপালিও শিখেছি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনও গুজরাটি সৈন্যের সাথে আমার এজীবনে পরিচয় হয়নি যার কাছে আমি গুজরাটি শিখতে পারি।”

জনতার মাঝে নেমে এলো পিনড্রপ সাইলেন্স!

ঘটনা ২
———–

Robert Whiting, একজন ৮৩ বছর বয়সী আমেরিকান নাগরিক প্লেনে করে প্যারিস এয়ারপোর্ট পৌঁছলেন। বয়স হওয়ার দরুন তিনি কাস্টমস কাউন্টারে নিজের পাসপোর্টটি খুঁজতে একটু বেশি সময় নিচ্ছিলেন।

“আপনি কি আগে কখনও ফ্রান্সে এসেছেন?” তরুণ কাস্টমস অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।

“হ্যাঁ, এসেছি।” Whiting উত্তর দিলেন।

“তাহলে এখানে যে নিজের পাসপোর্ট দেখানোর জন্য আগে থেকেই বার করে রাখতে হবে, সে জ্ঞান আপনার থাকা উচিত।” কাস্টমস অফিসার উপহাস করলেন।

“আগের বার যখন এসেছিলাম, পাসপোর্ট দেখাতে হয়নি।”

“অসম্ভব! আমেরিকানরা যখনই ফ্রান্সে আসে, তাদের পাসপোর্ট দেখাতেই হয়।”

আমেরিকান ভদ্রলোক দীর্ঘ সময় তরুণ কাস্টমস অফিসারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে শুরু করলেন-

“ওয়েল, আমি যখন ১৯৪৪ সালের ৬ই জুন (D-Day) ভোর ৪:৪০এ মিত্রপক্ষের অন্যান্য সৈন্যদের সঙ্গে Omaha বীচে এসে নেমেছিলাম তোমাদের দেশকে স্বাধীন করার এবং হিটলারকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে, তখন কিন্তু সেখানে একজন ফরাসীকেও আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করার জন্য উপস্থিত থাকতে দেখিনি।”

সমগ্র ফরাসী পাসপোর্ট অফিসে নেমে এলো পিনড্রপ সাইলেন্স!

ঘটনা ৩
———–

১৯৪৭ সাল। আমাদের দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। জওহরলাল নেহরু সাময়িকভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সেইসময় একদিন এক বৈঠক ডাকা হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক (Commnder-in-Chief) নিয়োগ করার উদ্দেশ্যে। সেই বৈঠকে নেহরু প্রস্তাব রাখলেন যে একজন ব্রিটিশ অফিসারকেই এই পদ দেওয়া উচিত কারণ আধুনিক যুদ্ধের ও সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের কারোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই।

বৈঠকে উপস্থিত সমস্ত সদস্যের মুখে কোনও কথা নেই। সবাই ব্রিটিশ শাসন ও ব্রিটিশ শিক্ষায় অভ্যস্ত। সেবা করতে জানেন কিন্তু নেতৃত্ব দিতে জানেন না।

কিছুক্ষণ পরে সেনাবাহিনীর এক অভিজ্ঞ অফিসার নাথু সিং রাঠোর কিছু বলার অনুমতি চাইলেন। নেহরু বিস্মিত হলেও তাঁকে অনুমতি দিলেন।

রাঠোর নেহরুকে বললেন “হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক। একইভাবে যেহেতু আমাদের দেশ চালানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই, সুতরাং দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও একজন ব্রিটিশ হওয়া উচিত।”

বৈঠকে নেমে এলো পিনড্রপ সাইলেন্স!

অনেকক্ষন পর নেহরু নীরবতা ভাঙলেন।

“অফিসার রাঠোর, আপনি কী ভারতীয় সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?” নেহরুর প্রশ্ন।

“আমার মনে হয় জেনারেল কারিয়াপ্পা এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।” রাঠোরের জবাব।

এইভাবেই ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পা স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক হয়েছিলেন আর নাথু সিং রাঠোর প্রথম লেফটেন্যান্ট জেনারেল।

(ইংরাজি থেকে বাংলা অনুবাদ। ইংরাজি পোস্টটি সংগৃহীত)