Fail in English

|। *ইংরাজি ফেল*।|

ইংরাজিতেই সব লেখো ভাই, বাংলা ভাষা ঘোড়ার ডিম,
বাংলা থেকে বাংলা হটাও, এটাই স্লোগান , অতঃকিম!
বাংলাতে সব বললে করো ‘ *মুখ্যু* ‘বলে মশকরা,
সবকথাদের যায়না মোটেই ইংরাজিতে বশ করা।
ভুরু কুঁচকে দেখছো কেন? ভাবছো এসব কারসাজি?
দিলাম তবে শব্দ কিছু, ফেল যেখানে ইংরাজি।

‘ *গেঁড়ে*’ কিংবা ‘ *উদো* ‘বলে ডাকে যদি কেউ তোমায়
বাঙালী ঠিক বুঝে যাবে সেইকথাতে কি বোঝায় |
‘ *মায়ের ভোগে*’ যাওয়ার মানে ইংরেজ কি আর জানে !!
ঘাবড়ে যাবে বললে ‘ *মদন’ কিংবা ‘ *আতাক্যালানে* ‘।
ইংরাজিতে যায়না বলা ‘ *ধ্যাত্তেরিকা’, ‘ *আব্বুলিশ*,’
পারিস যদি ‘ *লে হালুয়া*’ ইংরাজিতে বদলে দিস।
আমরা জানি *হুমদো* কিংবা *মেনিমুখো* মানে কি,
‘ *দামড়া*’ কথার হদিশ আছে ইংরেজদের জ্ঞানে কি?
‘ *মাইরি*’ বলে দিব্যি খাওয়া ,ইংলিশে কি বল দেখি
‘ *ক্যাওড়ামো* ‘বা ‘ *ছ্যাঁচড়ামোটা*’ সাহেবসুবো বুঝবে কি?
‘ *পিন্ডি* যদি চটকে দিলাম’ ইংরাজি তার কি হবে?
‘ *চিমশেপড়ার*’ খুঁজতে মানে ডিকশনারি দৌড়বে।

আচ্ছা ছাড়ো , এসব নাহয় কথ্য ভাষায় বাক্যালাপ,
এসব কথা ভাববে কেন, তোমার গায়ে সভ্য ছাপ !!
‘ *সোহাগ* ‘ কথার ইংরাজি কি বলতে পারো খুব ভেবেও?
‘ *ন্যাকামি*’ ঠিক কাকে বলে, সাহেব খুঁজে জানতে চেয়ো।
ইংরাজি তাই থাকুক মাথায়, বাংলা -বুকের মধ্যে বাঁচে,
‘ *অভিমান*’ এর ইংরাজিটা পাইনি খুঁজে কারো কাছে ||

*(সংগৃহীত )*

Advertisements

Love marriage

shubhadrishti2বন্ধ লিফ্টের ভিতরে বলছি মিসেস রায় ,একটা কথা …কিছু মনে করবেন না…আপনার মেয়েটা কি জন্ম থেকেই এমন খোঁড়া? নন্দিতা বেশ হাসি মুখে বললো, হ্যাঁ গো ..জন্ম থেকেই ওর একটা পা ডিফেক্টিভ। মিসেস রায়, কিছু মনে করবেন না.. এই মেয়ের কি করে বিয়ে দেবেন? নন্দিতা আরেকটু হেসে বললো, আপনি আমার মেয়ের জন্য এতটা চিন্তা করছেন দেখে খুব খুশি হলাম। কিন্তু মিসেস সেন ..আমি তো আমার মেয়ের বিয়ের কথা ভাবিনি এখনো। ও তো সবে ক্লাস নাইন।
মিসেস সেন সাত তাড়াতাড়ি বললেন, আর নন্দিতা আমাকে তুমি রিক্তা বলেই ডেকো। একই কমপ্লেক্সের বাসিন্দা আমরা , পাশাপাশি থাকবো। মিসেস সেন, মিসেস রায় টা বড় অপরিচিতের মত লাগে।
নন্দিতা হাসি মুখে বললো, মাত্র মাস খানেক এসেছি। সব অভ্যাস হয়ে যাবে। রিক্তাদি আরেকটু কৌতূহলী হয়ে বলল, মিস্টার রায় তো বেশ বড় সর চাকরি করেন।তা শ্বশুর বাড়িতে কেউ এই খোঁড়া মেয়ে নিয়ে তোমাকে খোঁটা দেয়নি তো নন্দিতা? খোঁটা দিলেই কিন্তু বলো আমাকে। আমি ‘কুন্তলা ‘মহিলা সমিতির সেক্রেটারী। আমাদের কাজই তো নিপীড়িত, অত্যাচারিত মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো। নন্দিতা হেসে বললো, এখনো পর্যন্ত পৌলমিকে নিয়ে আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী কিছু বলেননি রিক্তা দি, যদি কোনোদিন দরকার হয় তো নিশ্চয় বলবো।
সামনেই পৌলমীর এক্সাম। নন্দিতা চাইছিল না ওর কানে এই ধরণের কথা গুলো যাক। তবুও বাড়ি বয়ে উপকার করতে আসা রিক্তা দিকে এবার আসুন… কথাটা বলতেও পারলো না। পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নন্দিতার ব্যক্তিগত জীবনে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে রিক্তাদি নিজের ফ্ল্যাটে ফিরলেন। আসলে অঞ্জনের ইচ্ছাতেই এই ঢাকুরিয়ার কাছে ফ্ল্যাটটা কেনা হলো। অঞ্জন বলেছিল,ওই জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকলে পৌলমীকে নিশ্চিন্তে মানুষ করা সম্ভব নয়। রোজই কোনো না কোনো আত্মীয় এসে পৌলমীর বাঁ পায়ের প্রবলেম নিয়ে অতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ওদের অতিরিক্ত আগ্রহই পৌলমীর সংকোচের কারণ।
নন্দিতাও স্বামীর কথায় সায় দিয়েছিল। তারপরেই ঢাকুরিয়া এই ফ্ল্যাট।
এখানে এসেও শান্তি নেই। থার্ড ফ্লোরের রিক্তাদি, সেকেন্ড ফ্লোরের সীমা বৌদির আন্তরিকতায় জর্জরিত হচ্ছে নন্দিতা। এদের আবার পৌলমীর মত খোঁড়া মেয়ের বিয়ের চিন্তায় রাতের ঘুম চলে গেছে। মাঝে মাঝে খুব ভেঙে পড়ে নন্দিতা। মনে হয় পৌলমীকে নিয়ে যে যুদ্ধটা ও চালাচ্ছে সেটা কি সফল হবে।ছোট্ট পৌলমীর বাঁ পায়ের পাতাটা একটু বাঁকা ছিল। তাই ছোট বেলায় হাঁটতে শেখার সময় ও খালি ধুপধাপ করে পড়ে যেতো। নন্দিতা ওর পায়ে পরিয়ে দিয়েছিল বিশেষ জুতো। সেদিন থেকেই পৌলমী ওই পাটাকে একটু টেনেই চলে। প্রথম প্রথম নন্দিতার কষ্ট হলেও পরে পৌলমীর কথা ভেবেই চোখের জল মুছেছে। অঞ্জন বলতো, পৌলমী আমাদের সন্তান, তাই ওকে সাফল্যের পথে পৌঁছে দেবার দায়িত্বটা কিন্তু আমাদের।
ট্রেনে, বাসে, স্কুলে সব জায়গায় উত্তর দিতে দিতে বড় হয়ে উঠেছে পৌলমি।
সামনেই ওর মাধ্যমিক। রাত জেগে পড়ছে ও। পরীক্ষাগুলো ওর কাছে চ্যালেঞ্জ। বন্ধুদের মত ও ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারেনা। বন্ধুদের মত কোনোদিন স্কুলের স্পোর্টসে নাম দিতে পারেনি। তাই বইয়ের অক্ষরগুলোই ওর লক্ষ্য।পৌলমীর মাধ্যমিক শেষ। অঞ্জন বললো, আচ্ছা বেড়াতে গেলে কেমন হয়? পৌলমী সবার আগে আপত্তি জানালো। না না, আমি সাইন্স নিয়ে ভর্তি হবো ,তাই কাল থেকেই ম্যাথ শুরু করতে চাই। অঞ্জন বললো, মেয়ে যখন সিরিয়াস তখন আমরা নিরুপায়। তবে ইদানিং নন্দিতা মেয়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখছে। বিকেল হলেই পৌলমি লিফ্ট এ করে উঠে যায় ফ্ল্যাটের ছাদে। আগে কখনো ছাদে উঠতে চাইতো না। বড্ড ঘরকুনো ছিল। যাক বাবা, নতুন ফ্ল্যাটটা যে ওর পছন্দ হয়েছে এটাই অনেক।
তোমার ম্যাথ কেমন হয়েছে ? বেশ ভালো।
তোমার কেমিস্ট্রি থার্ড পেপার কেমন ছিল?
মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া পৌলমীর সাথে ছাদের কোনায় গল্প করছে রক্তিম। রক্তিম কেমিস্ট্রি নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। এই কমপ্লেক্সেই থাকে। সেদিন হঠাৎ বৃষ্টি আসায় পৌলমীকে মা পাঠিয়েছিল ছাদ থেকে জামা কাপড় গুলো তুলে আনতে। পৌলমী বৃষ্টিকে হারিয়ে একা পেরে উঠছিল না। আরেকটু হলেই দক্ষিণ দিকের কাপড়গুলো ভিজে যেত। সেই অবস্থায় হঠাৎই একটা মুখ চেনা ছেলে এসে ওর সাথে জামা কাপড় তুলতে থাকে । পৌলমী বলেছিল, থ্যাংকস…
ছেলেটি হেসে বলেছিল, আমি রক্তিম থার্ড ফ্লোরে থাকি।
পৌলমী বলেছিল, বৃষ্টি আসছে তো তুমি নেমে এস।
কাঁধ উঠিয়ে হেসেছিল রক্তিম।
ধুর! পালাবো কি ? আমি তো বৃষ্টি আসছে দেখেই ছাদে এলাম। বলতে বলতেই হুড়মুড়িয়ে নেমেছিল বৃষ্টি। পৌলমী তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল দুহাত ভর্তি শুকনো জামা কাপড় নিয়ে।
বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। পৌলমীর বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল, ওই এলোমেলো, অগোছালো ছেলেটাকে। যে কিনা ভিজবে বলেই ছাদে উঠেছে। আর ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে পারেনি। রক্তিমের ভেজা দেখবে বলেই মায়ের চোখ বাঁচিয়ে উঠে গিয়েছিল ছাদে।
রক্তিম দুহাত আকাশে দিকে করে বৃষ্টিকে আহ্বান জানাচ্ছিলো। পৌলমীকে দেখেই হাত নেড়ে ডেকেছিল। বলেছিল, দেখো বৃষ্টিরা কথা বলে।
কৌতূহলী হয়ে কান পেতেছিলো পৌলমী। রক্তিম বললো, শুনতে পাচ্ছ ..বৃষ্টিরা বলছে…পৌলমী খুব মিষ্টি মেয়ে। ওর সাথে বন্ধুত্ব করা উচিত।
ধ্যাৎ মিথ্যেবাদী …বলেই সরে গিয়েছিল পৌলমী। তারপর থেকেই সকলের অলক্ষ্যে ওদের বন্ধুত্বটা গড়ে উঠেছিল।
না, ফ্ল্যাটের কারোর সামনে রক্তিম কিছুতেই কথা বলতো না পৌলমীর সাথে। রক্তিম বলতো, ওদের বন্ধুত্বের সাক্ষী থাকবে…নীল আকাশ, উদাস বাতাস, বৃষ্টির নোনা জল।
সবার অলক্ষ্যেই ওরা বড় হয়ে উঠলো একই কমপ্লেক্সে।
রক্তিম এখন এমসিএ করছে।
পৌলমীরও সেকেন্ড ইয়ার।
হাউজিংয়ের দুর্গাপূজায় লাল শাড়ি পরে অঞ্জলী দিয়েছে পৌলমী। দুটো মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি বারবার ছুঁয়ে গেছে ওকে। কানের কাছে অঞ্জলীর মন্ত্রের সাথেই উচ্চারিত হয়েছে…
এত সেজেছ কেন? সকলে তাকাচ্ছে যে আমার বউটার দিকে।
লজ্জায় রাঙা হয়েছে পৌলমীর গাল।
সন্ধ্যেতে সবাই যখন ব্যস্ত থেকেছে পুজোর হিড়িকে। তখন দুটো ছায়া মূর্তির ফিসফিস শোনা গেছে, লিফটের বন্ধ দরজার ভিতরে।
কি হচ্ছে রক্তিম?
প্রতিটা ফ্লোরে লোক দাঁড়িয়ে আছে। তুমি একবার ছয় তলায় উঠছ .. একবার গ্রাউন্ডে নামছ…
এবার লিফ্ট থেকে বেরও, লোকে সন্দেহ করবে যে।
রক্তিম নিজের ঠোঁটে হাত ছুঁইয়ে বলেছে, লিফ্ট থেকে বেরোনো তো তোমার হাতে পৌলমী ! একটা…প্লিজ।
পুজো মণ্ডপে হাসির রোল..তার মধ্যেই রিক্তাদি বললো, ওমা নন্দিতা আজ পৌলমীকে শাড়ি পরে ভারী মিষ্টি লাগছিলো। ও যখন চুপ করে বসেছিলো তখন বোঝাই যাচ্ছিল না ওর পায়ের প্রবলেম টা। এত আলোর রোশনাই এর মধ্যে নিমেষে কালো হয়ে গিয়েছিল নন্দিতা মুখটা। রিক্তাদির কথায় সায় দিয়ে অনেকেই বলেছিল, সেকেন্ড ইয়ার তো হলো, বেশ বড় হয়ে গেল পৌলমী। এত মিষ্টি মেয়েটা,অথচ পায়ের জন্য কি করে যে বিয়ে হবে কে জানে?
নন্দিতার মনে হচ্ছিল,এদের কারোর সংসারে কোনো সমস্যা নেই। একমাত্র সমস্যা পৌলমীর বিয়ে। হঠাৎই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পৌলমী বললো, ও কাকলী কাকিমা.. কাল কাকু অনেক রাতে টলতে টলতে ফিরলো, ঘরে ঢুকেই চিৎকার করছিল… তোমাকে মারে নি তো ? আমি জানালার ধারে বসে পড়ছিলাম তাই দেখতে পেলাম।
কাকলি কোনোমতে আঁচল ঠিক করে বললো, আসলে তোর কাকু বড় চাকরি করে তো তাই ওসব একটু খেতে হয়। নন্দিতা দেখলো, তার সেই মুখচোরা ঘরকুনো মেয়েটা বেশ কথা বলতে শিখেছে। রাতে শুয়ে অঞ্জনকে বলল, শুনছো…তোমার মেয়েটা মনে হচ্ছে প্রেম করছে। অঞ্জন এক মুখ হেসে বলেছিল, ভালো তো। নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করলে মন্দ কি?
নন্দিতা বলেছিল, ছেলেটা যে কে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
শোনো রক্তিম, আমি কিন্তু চাকরি না পেয়ে বিয়ে করবো না। রক্তিম বললো, তোমার কি মনে হয় আমি এখুনি তোমাকে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। আরে আমিও আগে সেটেল হই।
তাছাড়া আমি শুনেছি, যাদের একটা পা একটু জখম হয় তাদের আরেকটা পায়ে কাকাবাবুর মত জোর থাকে। তাই এখন থেকেই তোমার লাথি খাওয়ার ইচ্ছে নেই।
দুমদাম দুটো কিল মেরে পৌলমী বললো, তাদের হাত দুটোও বেশ শক্ত হয়।
এদিক ওদিক তাকিয়ে ফট করে একটা চুমু খেয়ে রক্তিম বললো, আর তাদের ঠোঁটটা ভীষণ মিষ্টি হয়।
রক্তিম সেদিন বলেছিল, শোনো পৌলমী… নিজের পায়ের ওই সমান্য ডিফেক্ট নিয়ে যদি হীনমন্যতায় ভোগ তাহলে আর আমাকে ভালোবেসো না। কেউ কিছু বললেই দেখেছি তুমি বড্ড সংকুচিত হয়ে যাও। তুমি কি তাদের পায়ে হাঁটছ?
সেদিনের পর থেকেই মুখ খুলেছে পৌলমী।
রক্তিম জব জয়েন করেছে।
আজ সেই উপলক্ষ্যে হাউজিংএর লনে একটা ছোট্ট পার্টি আছে।
সন্ধ্যের স্ন্যাকস, কোল্ডড্রিং।
আজ একটু বেশিই সেজেছে পৌলমী।
পিঠের শিরা দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যাচ্ছে ওর।
কাকলী কাকিমা মাকে বলছে, ইচ্ছে তো আছে সামনের মাসেই নীলাঞ্জনার সাথে রক্তিমের রেজিস্ট্রিটা করিয়ে দেবার। আসলে রক্তিমের বাবা আর আমার হাজবেন্ড তো অফিস কলিগ। তাই ওদের দুজনেরই খুব ইচ্ছে। মা হাসছে, বলছে এটা তো খুব ভালো হবে। নীলাঞ্জনা আর রক্তিমকে খুব ভালো মানাবে।
হালকা গোলাপি নেটের শাড়িটা একঝটকায় খুলে ফেললো পৌলমী। ম্যাচিং অর্নামেন্টস বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মা বললো, কিরে সাজগোজ খুললি কেন? নিচে পার্টিতে যাবি না?
না আমি কোথাও যাবো না, আমার মাথা ব্যাথা করছে।
জানালা দিয়ে দেখছে পৌলমী। নিচের ফাঁকা লনটা বেশ সাজানো হয়েছে। একটা ব্লুইস ব্লেজারে রক্তিমকে দারুন লাগছে। নীলাঞ্জনাও বেশ সুন্দর একটা গাউন পরেছে। রক্তিম খুব হাসছে।
পৌলমীর ঘর অন্ধকার। আলো সহ্য হচ্ছে না ওর।
এতগুলো বছর ধরে রক্তিম এই মারাত্মক সত্যটা লুকিয়ে রেখেছিল ওর কাছ থেকে। দুই বাড়িতে বিয়ের কথা প্রায় পাকা। খোঁড়া মেয়ের ঠোঁট ছোঁয়াটা বোধহয় সহজ, কিন্তু তাকে বিয়ে করাটা একটু কঠিন!
অবাধ্য নোনতা জলেরা পৌলমীর গাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
রক্তিম বার দুই পৌলমীর অন্ধকার ঘরের দিকে তাকালো। আজ নীলাঞ্জনা একটু বেশিই কথা বলছে রক্তিমের সাথে।
পৌলমীর মনে পড়ে যাচ্ছে সেই প্রথম দিনের বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতি।
বার দুয়েক বেজে উঠলো পৌলমীর মুঠোফোন। রক্তিম করছে। ইচ্ছে করছে না কলটা রিসিভ করতে।
কি হলো, তুমি কাল পার্টিতে গেলে না কেন?
পিছন পিছন হাঁটছে রক্তিম। রাস্তার ফুট পথ ধরে নিজের অসমর্থ পাকে টেনে নিয়ে চলেছে পৌলমী।
যখন কাকলি কাকিমার কাছে শুনলাম তোমার আর নীলাঞ্জনার বিয়েটা বহুদিন ধরেই স্থির হয়ে আছে, তখন আর অবঞ্চিতের মত যেতে ইচ্ছে করলো না।
বিয়েটা তো দুই বাড়ির লোক ঠিক করেছে। আমি তো ঠিক করিনি।
ঘুরে দাঁড়িয়ে পৌলমী বললো, এতদিন বলনি কেন?
ওই জন্যই কি কমপ্লেক্সের কাউকে আমাদের রিলেশন জানাতে চাওনি?
প্রশ্নের মুখে পড়ে তোতলাচ্ছে রক্তিম।
জানাই নি কারণ, আমাদের নিজেদের এস্টাব্লিশমেন্টের প্রয়োজন ছিল।
তাছাড়া আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা কি জনে জনে জানানোর প্রয়োজন আছে পৌলমী?
পৌলমী গম্ভীর ভাবে বললো, আমার মনেহয়না আমাদের আর মেলামেশা করার প্রয়োজন আছে।
রক্তিমকে অবাক করে দিয়ে একা অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেল পৌলমী।
ছাদের ওই কর্ণারটা একই আছে, শুধু সন্ধ্যের অন্ধকার নামার সময়ে ওখানে আর কেউ দাঁড়ায় না।
মা সেদিন এসে বললো, বুঝলি পৌলমী, আজ নীলাঞ্জনার মা গয়না কিনেছে, মেয়ের বিয়ের জন্য, আমাকে দেখাচ্ছিল।
পৌলমী এখন শুধুই নীরব শ্রোতা।
হঠাৎ করে কখনো লিফটের দরজায় দেখা হয়ে যায় দুজনের। পৌলমী ভুলতে চায় বন্ধ লিফটের ভিতরের গল্পটা। রক্তিম অপ্রস্তুত মুখে পাশে সরে দাঁড়ায়।
একটা অজানা ঝড়ে ভেঙে গেছে সেই মেয়েবেলা থেকে দেখা স্বপ্নটা।
পৌলমী কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসছে।
রক্তিম দশটা -পাঁচটা জব করছে। রোজ সূর্য উঠছে, কমপ্লেক্সের সামনে বেকারির গাড়িটাও বাঁশি বাজিয়ে সকলকে ডাকছে। শুধু সকলের অলক্ষ্যে দুটো মানুষের চোখের ইশারাতেই আজ ফাঁকি।
মা ব্যাংকে জবটা পেয়ে গেলাম।
অঞ্জন বললো, আমি জানতাম তুই পারবি।
বাপি, এই ফ্ল্যাট টা বেচে অন্য কোথাও চলে গেলে কেমন হয়?
নন্দিতা বললো, কেন রে? তোর ব্যাংক তো এখান থেকে বেশ কাছেই হবে।
নিশ্চুপ পৌলমী।
কি বলবে বাবাকে ?
রোজদিন তার স্বপ্নের মৃত্যু দেখছে এই কমপ্লেক্সের ছাদের কার্নিশে, লিফটের বন্ধ ঘরে, ব্যালকনির ক্যাকটাসের চোরা ইশারায়। লনের সবুজ ঘাসের মধ্যে মৃত্যু দেখছে ওদের শৈশব প্রেমের। ওখানেই হয়তো রক্তিম সিঁদুর পরাবে নীলাঞ্জনার সিঁথিতে।
আর কল্পনা করতে পারছে না।
রক্তিমের বাইকটা থামলো গ্রাউন্ডের গ্যারেজে।
আজ পৌলমীও ফিরেছে একই সময়।
একই সাথে লিফ্ট উঠলো দুজনে। পৌলমী 5 বটন টেপার আগেই রক্তিম হাত দিয়ে গার্ড করলো সুইচ গুলো।
আজ এই লিফ্ট ততক্ষণ চলবে যতক্ষন না তুমি আমাকে ক্ষমা করছো।
দেখো পৌলমী, মা বাবা বোকার মতো কি ঠিক করেছে তুমি সেটাকে কেন গুরুত্ত্ব দিচ্ছ?
আমাদের এত বছরের ভালোবাসা কি তাহলে মিথ্যে?
পৌলমী বললো, তুমি কেন বলনি?
রক্তিম বললো, আমি এটাকে গুরুত্ব দিই নি। আমি মাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, আমি নীলাঞ্জনাকে বিয়ে করবো না।
লিফটের সুইচ ছাড়ো রক্তিম।
না, ছাড়বো না। একবার সাত তলায় উঠছে লিফ্ট একবার গ্রাউন্ডে নামছে।
আগে বলো, তুমি আমাকে বিয়ে করবে নাকি আমি ঐ ছাদের কার্নিশ থেকে লাফ দেব?
পৌলমী বললো, তুমি উঁচু থেকে তাকাতেই ভয় পাও। তুমি আবার লাফ দেবে কি করে?
রক্তিম বললো, তুমি জানোনা ভালোবাসায় মানুষ সব করতে পারে।
প্লিজ রক্তিম লিফ্ট বন্ধ কর। বাইরে চিৎকার হচ্ছে।
হঠাৎ করেই লিফ্টটা থেমে গেলো থার্ড ফ্লোরে এসে। সম্ভবত ইচ্ছে করেই পাওয়ার অফ করে বন্ধ করানো হলো। প্রায় আধ ঘন্টায় প্রচুর লোক জমেছে। লিফটের দরজা খুলতেই সকলের চিৎকার।
রক্তিম বললো, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আমরা ভিতরে আটকে গিয়েছিলাম।
রিক্তা আন্টি বললো, তুই এতক্ষন ভিতরে, তো ফোন করিস নি কেন?
তোর বাবাকে একটা কল করতে পারতিস।
না মা, আমি ভাবছিলাম ঠিক হয়ে যাবে।
রিক্তা আন্টি মানে রক্তিমের মা বাঁকা চোখে তাকালো পৌলমীর দিকে।
এই মেয়েটা কি করছিল তোর সাথে ?
রক্তিম বললো, ওই মেয়েটাকে রাজি করাতেই তো এতক্ষণ লিফ্টটা চালাতে হলো।
রক্তিম কি সব বলছে সকলের সামনে ! পৌলমীর বাবা মাও উপস্থিত এখানে। কাকলি কাকিমারাও আছে।
রক্তিম বললো, আসলে মা পৌলমী আর আমার প্রেমটা হয়ে ছিল ও যখন ক্লাস টেনে পড়ে। এখন পৌলমী বলছে, ও নাকি আমাকে বিয়ে করবে না।
রিক্তা আন্টিকে আকাশ থেকে ঠেলে ফেলে দিলেও এতটা চমকাত না। ছেলের মুখে পৌলমীর নাম শুনে যতটা চমকাল।
চিরটাকাল রিক্তা আন্টি বলে এসেছে, হ্যাগো নন্দিতা তোমার ঐ খোঁড়া মেয়ের পাত্র পেলে হয়? সেই মেয়ের সাথেই নাকি প্রেম করে বসে আছে তার একমাত্র ছেলে!
রিক্তা আন্টি বললো, তুই ভাবলি কি করে ওই খোঁড়া মেয়েকে আমি আমার ঘরের বউ করবো?
মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে পৌলমীর।
এত জনের সামনে ওকে এভাবে অপমান করার অধিকার কে দিয়েছে রক্তিম কে?
নিজের মাকে তো রক্তিম ভালো করেই চেনে!
রক্তিম হাসতে হাসতে বললো, কি মুস্কিল মা, আমি তো একবারও বলিনি তোমাকে বিয়ে করতে, পৌলমী তো আমার বউ হবে। ও খোঁড়া না অন্ধ সেটা আমিই বুঝে নেব।
রিক্তা আন্টি চিৎকার করে বললো, হ্যারে পৌলমী শেষ পর্যন্ত তুই আমার ছেলেকে পাকড়াও করলি?
হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল পৌলমীর!
সে বলল, না আন্টি তোমার ছেলেই আমাকে পাকড়াও করছে। আমি সেই মেয়েবেলা থেকেই ওর মনে মিশে আছি। পারলে তোমার ছেলেকে সামলে রাখো।
রক্তিম বললো, শোনো মা .. আমি পৌলমীকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারবো না । এবার তোমরা দেখো কি করবে।
নন্দিতা আর অঞ্জন বসে আছে সোফায়। পৌলমী আরেকটা চেয়ারে। নন্দিতা বললো, রক্তিমকে আমাদের পছন্দ। কিন্তু রিক্তাদি কি মেনে নেবে?
পৌলমী বললো, সেটা রক্তিমের ভাবনা মা।
আমি তো ওকে বলিনি আমাকে বিয়ে করতেই হবে। ওই তো…
কথা শেষের আগেই বেলটা বেজে উঠলো। রিক্তা আন্টি ঝড়ের মত ঢুকলো ঘরে। পৌলমি তুই একবার চল। রক্তিম আমার সাথে ঝগড়া করে কোথায় চলে গেছে। ফোনটাও ধরছে না।
তুইই পারবি ওকে ফিরিয়ে আনতে। তুই ফোন করে বল, আমি তোদের বিয়ে মেনে নিয়েছি। ওকে ফিরতে বল। রিক্তা আন্টি মহিলা সমিতির সেক্রেটারি। সেই কিনা আজ পৌলমীর মত খোঁড়া মেয়ের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে?
রক্তিম যদি কিছু করে বসে… রিক্তা আন্টি কাঁদছে।
ফোনটা বেজে যাচ্ছে। ধরছে না রক্তিম। সবাই খুঁজতে বাইরে বেরোচ্ছে।
পৌলমী আস্তে আস্তে উঠে গেছে ছাদে। দক্ষিণ দিকের নির্দিষ্ট কোনটায় একটা চেনা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
পৌলমী বললো, কি হচ্ছে ! সবাই খুঁজছে তোমায়, নীচে চলো। আন্টি কাঁদছে।
রক্তিম বললো, অনেকদিন পর আবার আমরা ছাদে।
ওই দেখো নীহারিকা তাকিয়ে দেখছে আমাদের।
শোনো শোনো, নীহারিকা কি বলছে শোনো।
পৌলমী বললো, কি বলছে?
বলছে পৌলমী খুব মিষ্টি মেয়ে, ওকে এখুনি একটা চুমু খা রক্তিম, দেরি করিস না।
ধ্যাৎ…

ডাউন নৈহাটি লোকাল

Local train

সকাল ৯.০৮ এর ডাউন নৈহাটি লোকাল। তিন নম্বর কামরার প্রথম দরজা।

আপ ট্রেনটা নৈহাটি স্টেশনে ঢোকামাত্রই হুড়মুড় করে উঠে, অন্তত গোটা পনেরো সিটে রুমাল ব্যাগ চিরুণি লাইটার ফেলে জায়গা রাখা, শুধু নিজের নয় গোটা পরিবারের জন্য। পরিবারই বটে। ভিন্ন পেশার, ভিন্ন আয়ের, ভিন্ন চেহারার, ভিন্ন লিঙ্গের, ভিন্ন ধর্মের যেন গোটা একটা ভারতবর্ষ। তারপর সবাই একসাথে যাওয়া শিয়ালদহ অবধি। সেখান থেকে যে যার নিজ নিজ অফিসের পথে। এ হয়ে গেছে গত দশ বছরের রোজকার সকালের রুটিন। শনিবারে সংখ্যাটা কিছু কম হলেও অন্য পাঁচটা দিন উপস্থিতি মোটামুটি একইরকম থাকে, গড়ে চল্লিশ জন।

ঠিক কবে থেকে এই পরিবারের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি মনে করতে পারিনা। কারণ এই বন্ধন বলে কয়ে একদিনে হয়নি। সকাল দশটা পনেরোর মধ্যে অফিসে পৌঁছানোর তাগিদে এই ট্রেনটা ধরা অবধারিত ছিল। একই কমপার্টমেন্টে রোজ যেতে যেতে ঘোষদা, বোসদা, মিত্তিরদা, তনুদি, জবাদি বলে ডাকতে ডাকতে কবে যে একটা পরিবার হয়ে গেছি খেয়ালই ছিল না। সরোজ ঘোষ ব্যাঙ্ক কর্মী, রথীন সেন ফেয়ারলির রেলের কেরাণি, সুব্রত দত্ত ব্যাঙ্কসাল কোর্টের উকিল থেকে বাবলা, ঘচাই, সন্টু শিয়ালদার হকার, কত পেশার নানান বয়সের মিলনস্থল এই নটা আটের ডাউন নৈহাটি লোকালের তিন নম্বর কামরা। সবাই যেন কত কাছের দিনের ঐটকু সময়ের জন্য। চেনা থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে একটা নিবিড় বন্ধন গড়ে ওঠা। না জানিয়ে কেউ কিছুদিন না আসলে, তার খোঁজ নেওয়া। কেউ বিপদে পড়লে তার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া, একসাথে পিকনিকে যাওয়া এর ওর বাড়ির বিয়ে পৈতেতে নিমন্ত্রণে অতিথি হয়ে যাওয়া। একটা অটুট পারিবারিক বন্ধন।

আমাদের এই নিত্যযাত্রী সমিতিতে একটি বৃদ্ধ দম্পতিও ছিলেন। এই গল্পের মূখ্য চরিত্র তারাই। জোর্তিময় দত্ত ও অনীতা দত্ত। ওনারা উঠতেন শ্যামনগর থেকে। ষাটোর্দ্ধ দত্তদা পোস্টাল বিভাগে কাজ করতেন, রিটায়ারমেন্টের পরে স্ট্র্যান্ড রোডের কোন একটা প্রাইভেট ফার্মে খাতা দেখেন। অনীতাদি কাজ করেন রেলে, পোস্টিং ফেয়ারলিতে। দত্তদা সুবক্তা, মিষ্টভাষী। নীচু গলায় মজার মজার কথা বলেন, খুব শান্ত প্রকৃতির। বরঞ্চ দিদি একদম উল্টো। বেশ হইচই করেন, মিষ্টি মিষ্টি করে এর ওর পিছনে লাগেন, মাঝে মাঝে ভাল ভাল গান শোনান। দিদির খুব ভাল গানের গলা। কিন্তু একটাই ব্যাপার যা সবাইকে খুব ভাবায়, তা হল, এই দম্পতিকে ট্রেনের এই সময়টুকে ছাড়া আর কোন সময় পাওয়া যায়না। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও কোন বাড়ির নিমন্ত্রণ হোক বা পিকনিকে যাননা। কোন না কোন একটা অজুহাতে ওরা নিজেদের সরিয়ে নেন। পরিবর্তে দত্তদা ফাইন দেন, সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে। তাতেই যেন সাত খুন মাফ।

আজ অনীতাদির অফিস জীবনের শেষদিন। ওনার রিটায়ারমেন্ট। আগামীকাল থেকে উনি আর আসবেন না। সবার মন খুব খারাপ। একজন নিকট আত্মীয়ের বিয়োগ ব্যথার মত বুকে বিঁধছে তার কাল থেকে না আসার বাস্তব খবরটা। আমাদের এই পরিবারের কেউ অবসর নিলে তাঁকে ফেয়ারওয়েল দেওয়া হয়। দিদির ক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। চাঁদা তুলে দিদির পছন্দের বটুয়া ব্যাগ, ফুল, মিষ্টি আনা হয়েছে। শ্যামনগরে ওনারা ট্রেনে উঠতেই প্রতিদিনকার অভ্যাসমত ভুটাই আর জগা সীট ছেড়ে বসতে দিল। শুরু হল সভার কাজ।

সবার আগে মিষ্টিমুখ। তারপর একে একে প্রত্যেককে বলতে হল দিদির সম্বন্ধে। আমিও বললাম। দিদি সেরকম কিছু বলতে পারলেন না। তার গলা ভারি হয়ে এল। সবশেষে বলার ভার পড়ল শ্রীমান জোর্তিময় দত্তদা’র।

আমার স্নেহের বন্ধুরা, খুব ভাল লাগছে তোমাদের আয়োজনে ডাকা এই অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে। আজ অনীতার সন্মানে যে অনুষ্ঠান তোমরা করছ, তা সত্যিই সাধুবাদ পাওয়ার দাবী রাখে। আজ সত্যিই খুব মন খারাপের দিন, কাল থেকে ও আর এইভাবে সবার সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে হইহই করতে করতে অফিসে যাবে না। কাল থেকে কেউ আর জগা, ভূটাই, মনার পিছনে লাগবেনা, গান শোনাবে না। সবাই মিস করবে অনীতাকে।

সবাই মাথা নীচু করে দত্তদার কথা একমনে শুনছে। উনার গলার আওয়াজের মাদকতায় সবাই বুঁদ হয়ে আছে।

ওকে কাল থেকে আমিও খুব মিস করব।

চমকে সবাই এ ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম, “মানে?”

উনি সেই কথার উত্তর না দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে চললেন.. শুধু অনীতাকে নয় তোমাদের সবাইকে খুব মিস করব। কাল থেকে আমিও আর আসব না। এই প্রসঙ্গে একটা কথা তোমাদের এই প্রথমবার জানচ্ছি, অনীতা আমার স্ত্রী নয়, প্রেমিকাও নয়। বন্ধু বলতে যা বোঝায়, তাও হয়ত নয়। কারণ একে অপরের বিপদে আপদে, ভালয় মন্দয় আমরা একে অপরের পাশে যদি না থাকতে পারি, তাহলে তাকে কি আর বন্ধু বলা যায়? সবার মনে তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, সম্পর্ক টা আসলে কি? উত্তর হবে কিছুই না। একদম নিত্য সহযাত্রী। ঠিক তোমাদের সাথে যেমন দেখা হয় রোজ সকালের এই এক ঘন্টা, ওর সাথেও তাই হয়। কোনদিন কথা হয়, কোনদিন হয়না। তোমরা পাশাপাশি বসতে দিলে কোনদিন গায়ে গায়ে একটু ছোঁয়া লাগে। তার বেশি কিছু নয়। বছর পনের আগে তোমাদের মত এইরকম একটি গ্রুপে যাতায়াত করতে করতে আমাদের প্রথম দেখা হয়। তখন ওর পঁয়তাল্লিশ আর আমি পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। বেশ কিছুদিন পর থেকেই বুঝতে পারি, ওর সাথে দেখা করার এক তীব্র আকুতি আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। গত পনেরো বছর আমরা একসাথে যাতায়াত করেছি। তবে ঐ শিয়ালদহ স্টেশন অবধি। আমি পাঁচ বছর আগে অবসর নিয়েছি চাকরি থেকে, দিনটা ছিল শনিবার। তোমরা ঘটা করে ফেয়ারওয়েল দিয়েছিলে। কিন্তু পরের সোমবারেই আবার এই ট্রেন ধরতে স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলাম। তোমরা জিজ্ঞেস করাতে, প্রাইভেট ফার্মের চাকরির, মিথ্যে গল্প বলেছি। শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে কি করা যায় ভেবেছি। তারপর কিছু না পেয়ে ফিরতি ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরেছি। আর এই রুটিন কাজ করে গেছি গত পাঁচ বছর। তোমাদের মত আমিও জানি অনীতা বিবাহিতা, স্বামী আর দুই ছেলে নিয়ে সুখের সংসার। ব্যাস আর কিছু অতিরিক্ত কখনোই জানতে চাইনি। জানতে চাইনি সে সুখি কিনা। সে আমাকে ভালবাসে কিনা। তাকে স্পর্শ করা দুর, কোনদিন হাতটাও ছুঁয়ে দেখিনি, তা কতটা ঠান্ডা বা কতটা গরম। কোন চাহিদা নেই, কোন যৌনতা নেই, কোন লালসা নেই, শুধু একটু চোখের দেখা। অনীতা প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে গুরুত্ব না দিলেও পরে আমার এই পাগলামো মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমার জন্য ওর বরাদ্দ ছিল এই অফিস যাওয়ার সময়টুকু।
দুটো মন কারো ক্ষতি চায়নি। চেয়েছিল বাঁধা সময়ের একটু সঙ্গ। আর তার জন্য শীত গ্রীষ্ম বরষা সব বাধাকে উপেক্ষা করে ট্রেন ধরতে আসা। আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস যে করেনি, তা নয়। করেছে। মিথ্যে বলেছি। বলেছি সকালের দুঘন্টার কাজ।

দত্তদা কিছুক্ষণ থেমে দম নিলেন। তারপর ধরা গলায় আবার শুরু করলেন, কাল থেকে এই ব্যস্ততা আর থাকবে না। থাকবেনা সকালে উঠেই ট্রেন ধরার তাড়া। তোমাদের সাথে কাটাতে পারা মূল্যবান মূহুর্ত। সব কিছু থেকে ছুটি। আমি যেন এই প্রথম অবসর নিলাম। কাল থেকে তোমাদের সাথে আর দেখা হবেনা। সবাই ভাল থেকো সুস্থ থেকো। অনীতার বাকি জীবন ভাল কাটুক এই কামনা করি। যেখানেই থাকো যেভাবেই থাকো হেসে খেলে কাটিও। তোমরা সবাই ভাল থেক।

আমি আমার তরফ থেকে একটা ছোট্ট উপহার অনীতাকে দিতে চাই।
অনীতা দি উঠে দাঁড়িয়ে দত্তদার হাত থেকে পাওয়া উপহারের মোড়ক খুলে ফেলতেই, বেরিয়ে এল একটা ছোট্ট পকেট ডায়েরি। পাতা উলটে দেখা গেল, দত্তদার অনীতাদির সাথে প্রথম দেখা হওয়ার দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত কি রঙের শাড়িতে কেমন লাগছিল, লেখা আছে। ডায়েরি টা শেষ হয়েছে একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে..
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা……..

অনীতা দি সবার জন্যই রিটার্ণ গিফট নিয়ে এসেছিলেন। কারোর জন্য পেন, কারোর জন্য গ্যাস লাইটার। দত্তদার হাতেও একটা ছোট্ট গিফট প্যাক তুলে দিলেন। খুলে বার হল, একটা ডিজিটাল ঘড়ি। এলার্ম দেওয়া। সময় ৯.০৮। এলার্মে সেট করা গান ভেসে উঠল..
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে ম’ম।
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমায়
নিশীথিনী সম।…

সারা কমপার্টমেনট বাকরুদ্ধ। পাশের লোকের নিঃশ্বাস পড়ার আওয়াজও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। কারো আর কথা বলার ক্ষমতা নেই। ট্রেন খুব ধীরে শিয়ালদহ স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্লাটফর্ম ছুঁল। ঘড়িতে দশটা বেজে দু মিনিট।

ট্রেন থেকে নেমে যন্ত্রচালিতের মতো হেঁটে চলেছি। ভাবছি এই সম্পর্ককে কি বলা যায়? পরকীয়া, অবৈধ না কি প্লেটোনিক।
সংগ্রহীত

বিলুপ্ত

পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে নিলেও অভিভাবকরা যাঁদের বলতেন বেশ করেছেন, পাশফেলের সাথে সাথে সেই মাস্টাররাও কেমন উধাও হয়ে গেলেন। যাঁদের ভয়াল চাউনি একক্লাস কোলাহলকে স্তব্ধ করে দিতো, পড়া না পারলে নিল ডাউন বা বেঞ্চে দাঁড় করাতেন যাঁরা নিয়মিত, যাঁরা ধুতি পাঞ্জাবী পরে স্বচ্ছন্দে পড়াতে পারতেন ওয়ার্ডওয়ার্থ টেনিসন, শেলী, হেমিংওয়ে, যাঁদের শাসনের মধ্যে স্নেহ থাকতো, যাঁরা চাইতেন গাধাগুলো ঘোড়া হোক বড় হয়ে, সেই সব মাস্টারমশাই আর দিদিমণিরা ক্রমেই বিলুপ্ত হলেন ডায়নোসরের মতো।

যদিও এই পাশফেলহীন মারধোর ব্যতিরেকে সন্তান মানুষ করার যুগে, তাদের না থাকাটাই বোধহয় যুক্তিসঙ্গত। শুধু কি ধমকই সব, আদরও কি পাইনি ? অনাবিল কিছু পিঠচাপড়ানি কঠিন অংক সমাধানে, দশে আট দিয়ে সেই হেসে বলা এর থেকে বেশি আর দিই নি জীবনে, তিনদিন না এলে কোনো বন্ধুকে দিয়ে ছিলো খোঁজ করা নিয়মমাফিক, সেন্ট আপ হয়ে গেলে জড়িয়ে ধরাও ছিলো, বয়স্ক দুই চোখ জল চিক চিক।

গুগলের মতো হয়ে যাবতীয় নোটস আর তথ্যের ভাণ্ডার কাঁচিয়েকুঁচিয়ে যাঁরা আনতেন তুলে, ভালো নম্বরের আগে ভালো মানুষ হও ,সে আজব কথা যাঁরা শেখাতেন স্কুলে, কোথায় পাঠালে তাঁদের নির্বাসনে, ওহে ‘নম্বরই সব’ বলা ব্রেকিংনিউজে বাঁচা সুশীল সমাজ?

এই খুনে নীল তিমি যুগে প্রজন্ম বাঁচাতে হলে, তাঁদের যে ছিলো বড় প্রয়োজন আজ।

সংগৃহীত

ফিরে দেখা

চারতলার ছাদ জুড়ে ম্যারাপ, তার এক দিকে চটের পর্দার আড়ালে ঠাকুররা রান্না করছে সকাল থেকে। ইঁট আর গোবর মাটি দিয়ে বানানো হয়েছে দুটো বড়ো উনুন। কয়লার গনগনে আঁচে দুটো প্রমান সাইজের কড়া। সাত সকালেই জলখাবারে হয়ে গেছে লুচি, আলুর তরকারী আর সঙ্গে বোঁদে। অবশিষ্ট কিছু লুচি কাগজ চাপা দিয়ে ঝুড়িতে রাখা, তার পাশে একটা গামলায় কিছু বেঁচে যাওয়া আলুর তরকারি। কুমড়োর ছক্কা, ছোলার ডাল রান্না হয়ে গেছে। এবার হবে সকালের মাছ রান্না। এক কোণে বসে মশলা বাটছে একজন, একজন ঘন ঘন চোখ মুছে কেটে চলেছে পেঁয়াজ আর কম বয়সী একটা ছেলে ছাড়াচ্ছে রসুন। হামানদিস্তেতে মশলা গুঁড়িয়ে চলেছে ষন্ডা মার্কা একটা লোক। বড়ো বড়ো কাতলা মাছের টুকরো বিশাল নৌকোয় একতলায় কলের জলে ধুয়ে তাতে নুন হলুদ মাখাচ্ছে ঠাকুর। কড়ায় তেল গরম হচ্ছে, মাছ ভাজা হবে। অন্যদিকে ফিশ ফ্রাই গড়া শেষ, বিস্কুটের গুঁড়োয় মাখামাখি হয়ে বারকোষে সেজেগুজে বসে আছে তারা। ডেকচিতে কাগজ চাপা দেওয়া ভাত, পাশে বড়ো গামলিতে মুগের ডাল আর ট্রেতে বেগুন ভাজা। দুটো নৌকো বোঝাই কাঁচা মাংস এক পাশে রাখা। পুঁইশাক, কুমড়ো, মূলো, আলু ডাই করে কুটে রাখা আর একটা বারকোষে, ছেঁচড়া হবে মাছের মাথা দিয়ে। বিয়ে বাড়ির সকালের অবশ্য পদ।

ছাদের অন্যদিকে কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারগুলো এক কোণে হেলান দিয়ে রাখা, তার পাশে সার সার উঁচু করে রাখা লম্বা কাঠের টেবিল। সন্ধ্যে হতে না হতেই টেবিল পাতা হয়ে গেলো, সঙ্গে চেয়ার। এক একটা টেবিলে পাঁচজন করে বসার ব্যবস্থা। কাগজের রোল টেবিলে জল ছিটিয়ে বিছানো শেষ, তার ওপর দুপুরে ধোয়া লম্বাটে কলাপাতায় মাটির গেলাস উপুড় করা, তার পাশে উপুড় করে রাখা ছোটো খুড়ি। ব্যাচ শুরু হওয়ার আগেই গেলাস আর খুড়ি সরিয়ে ডানদিকের এক কোণে নুন আর এক চিলতে লেবু দেওয়া হলো। এই কাজটা ছোটদের জন্যে বরাদ্দ। নুন লেবুর পাশেই সেদ্ধ ছোলা/কড়াইশুঁটি, পোস্ত ছড়ানো এক চামচ হিমশীতল শাক ভাজা আর তেলে মাখামাখি সরু একফালি ন্যাতানো বেগুন ভাজা। চটের পর্দার গেটের মুখে বিয়েবাড়ি স্পেশালিস্ট মামা/কাকা/পিসে বা মেসো গোছের কেউ দাঁড়িয়ে তদারকি শুরু করেছেন। লোকজন বসতে না বসতেই ব্যাচ শুরু। সব গেলাসে জল দেওয়ার সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে ‘গেলো গেলো’ রব। ফুটো গেলাস দিয়ে জল গড়িয়ে গায়ের দিকে এগিয়ে আসছে। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে, কেউ আবার তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চেয়ার উল্টেছে। কোমরে গামছা বাঁধা গেঞ্জি গায়ে পরিবেশনকারী আধা ঠান্ডা দুটো করে লুচি ঝপাঝপ পাতে দিয়ে গেলো, তার কোনোটা গোল আবার কোনোটা অর্ধেক মোড়া। ট্রে হাতে আর একজন হাতায় করে কুমড়োর ছক্কা দিয়ে যাচ্ছে। এবার গরম লুচি রিপিট, সংগে একজন ছোলার ডালের বালতি নিয়ে হাতায় তুলে পাতে ঢেলে দিলো। গরমাগরম ফ্রাই এলো তারপর, তার পেছন পেছন একজন কাসুন্দির বাটি হাতে। তার মাঝেই চলছে ঘুরে ঘুরে পরিবেশনকারীদের ডজ করে পাশ কাটিয়ে, আমন্ত্রনকারী মেয়ে পুরুষের হাসি মুখে অতিথি আপ্যায়ন। আর তারই ফাঁকে ট্রে থেকে পটাপট ফ্রাই তুলে মুখে চালানও করে দিচ্ছে কেউ কেউ। এক দুরন্ত বাচ্চা খেতে খেতে দোল খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করে চেয়ার সমেত মাটিতে চিৎপটাং। পাশে বসা তার বাবা স্থানকাল ভুলে তাকে কান ধরে টেনে তুললেন। মাছের সংগে কারি পাতে পড়তেই সকলে সাবধান, কলাপাতার গা বেয়ে কোঁচানো ধুতি তার গন্তব্যস্থল। কিছু সেয়ানা লোক কলাপাতার তলায় লুচির টুকরো গুঁজে উঁচু করে ঝোলের আক্রমণ থেকে বাঁচবার চেষ্টায়। এরপর বালতিতে ডুব সাঁতার দিতে দিতে কচি পাঁঠার আগমন, সংগে দলা পাকানো হলুদ রঙের মিষ্টি পোলাও (ফ্রায়েড রাইসের প্রচলন তখনো ততটা হয়নি)। প্রায় সংগে সংগেই কাদার মতো এক থাবা টমেটোর চাটনি, সংগে তেল গড়ানো এক ফালি পাঁপড় ভাজা পড়লো পাতে। পাত তো নয়, দেখে মনে হয় ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে পাতের ওপর দিয়ে। সেটা শেষ হতে না হতেই, না ধোয়া খুড়িতে এক খাবলা দই। দইয়ে হাত দেওয়ার আগেই দরবেশ আর লেডিগেনির আগমন, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু আক্রমণ শানাচ্ছে মুহুর্মুহু। লেডিগেনির রস, মাংসের ঝোল আর চাটনীর মিশ্রনে অম্ল মধুর এক বিচিত্র স্বাদ দরবেশের। পেল্লাই সাইজের রসগোল্লা পাতে পড়ার সাথে সাথে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো লবঙ্গ গাঁথা পান। মানে, উঠে পড়ো বাছাধন, পরের ব্যাচ বসবে এবার। সিঁড়ির মুখে “ঠিক করে খেয়েছেন তো?” বলে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে নিমন্ত্রণকারীর কেউ না কেউ। …………..

এটাই আমাদের ছোটবেলা। এখন কাঁচের ভারী প্লেট নিয়ে লাইনে গিয়ে দাঁড়াই। নিজেকে কেমন যেন কয়েদি কয়েদি মনে হয়, পকেটে কয়েদি নম্বরটাই যা শুধু লেখা নেই। ঝলমলে আলোর নিচে রকমারি দেশি বিদেশি পদ পিতলের পাত্রে স্পিরিট ল্যাম্পের ওপর। প্রতিটি পদের সামনে দন্ডায়মান সীমান্তরক্ষীর মতো এক এক জন। রোবটের মতো হাত ওঠানামা করছে কঠিন মুখে। নিঃসন্দেহে স্বাদে গন্ধে ভালো প্রতিটি পদ, তবু বোকা অবুঝ মন আমার খুঁজে বেড়ায় কলাপাতার কোণে ঠান্ডা এক চামচ শাক আর ন্যাতানো বেগুনভাজাকে আর চোখ খুঁজে মরে স্যান্ডো গেঞ্জি পড়া এক ঝাঁক তরতাজা হাসিমুখ তরুণকে, যারা লোক বুঝে হাত চেপে পাতে ফেলে দেবে আরও দুটো রসগোল্লা। সাদা জামাপ্যান্ট পরা এক শিশু মোবাইল হাতে চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে গেম খেলছে এক মনে। সাবধান করতে গিয়ে নিজের মনেই হেসে উঠি, এ চেয়ার ফোল্ডিং কাঠের চেয়ারের মতো দোলালেও উল্টোয় না। আমন্ত্রণকারীরা সবাই ব্যস্ত। ধীর পায়ে বেরিয়ে আসি অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে, হাসি মুখে কেউ জিজ্ঞেস করার নেই, “ঠিক করে খেয়েছেন তো?”

সংগৃহীত

থাকে না শুধু মানুষগুলো

বের হচ্ছিলাম ঘর থেকে, এমন সময় বাবা বললোঃ তোমার কাছে কি ৫০০ টাকা হবে?

হঠাৎ কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো, বাবার দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে গেলো সেই ক্লাস টু’র একটি কথা।

বাবাকে বলেছিলামঃ বাবা ২ টাকা দেবে ?

বাবাঃ কেন? কি করবে ২ টাকা দিয়ে?

আমিঃ আইসক্রিম খাবো। (তখন এক টাকায় ৪ টা রঙিন আইসক্রিম অথবা ২ টো বরফের সাথে নারকেল দেয়া আইসক্রিম পাওয়া যেতো)।

বাবা ২ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা দিয়েছিলো,

বাবা-মা আসলেই বড়ই অদ্ভুত ক্যারেকটার, তারা সারাজীবন চেষ্টা করেছেন তাদের সর্বোচ্চটা আমাদের জন্য করার।

সময় কতোটা দ্রুত চলে যায়, আজ বাবা অবসরপ্রাপ্ত। কেন যেন খুব কান্না পেলো, জানি না।

ওয়ালেট হাতড়ে ১০০ টাকা বাদে যা ছিলো সবটা বাবাকে দিয়ে দিলাম।

বাবাঃ আরে পাগল, এতো দিয়ে আমি কি করবো?

আমিঃ বাইরে যাও, তোমার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও, চা কফি খাবে আর কি……

বলেই উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করলাম, নিজের চোখের জল এড়াতে।

আপনজনের জন্য সময়মতো কিছু করতে না পারলে কিসের চাকরি , কিসের ব্যবসা, এসব দিয়ে কি হবে, কিসের প্রাচুর্য, সবই তো ক্ষণস্থায়ী।

আমি মনে করি আমার বলে কিছু নেই, সব সাময়িকভাবে আমাকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে পরম ঈশ্বর । সবকিছুই ঠিকঠাক রয়ে যায়, থাকে না শুধু মানুষগুলো…..

সংগৃহীত