প্রেমের একাল সেকাল

গত এক দশকে যোগাযোগ বিজ্ঞানে (ইনফর্মেশন  TECHNOLOGY বা কম্যুনিকেশনে ) বিপ্লব ঘটে গেছে।  প্রেমের সঙ্গে যোগাযোগ বা কম্যুনিকেশন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  প্রেম পীড়ীত দুটি হৃদয় কথা বলার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। তাই প্রেমের ক্ষেত্রে যোগাযোগ একটা গুরুত্বপুর্ন বিষয়। কম্যুনিকেশনের বিপ্লবের সাথে সাথে তাই প্রেমের  রূপ ও চরিত্র পালটে গেছে । এই MOBILE, INTERNET’র  যুগে  কাছে না পাওয়ার, চোখে না দেখার সেই বিরহের সুখ বা দুঃখ, বেদনা আজকের প্রেমে নেই।  

সেকালে যোগাযোগ একটা বিরাট সমস্যা ছিল।  ইচ্ছামত যখন তখন যোগাযোগ করা যেত না, দেখা করা তো দূরস্থান। কারন তখন সামাজিক বা পারিবারিক বাধানিষেধ ছিল অত্যন্ত বেশি । রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে হলে তো  অবস্থা আরো কঠীন হত। তখন মেয়েরাও এখনকার মত এতোটা স্বাধীন বা স্বাধীনচেতা ছিল না। এমত অবস্থায়  প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন হত পাড়ার পরিচিত ঘনিষ্ঠ কোন COMMON বৌদি বা বৌদিদের মাধ্যমে। এমতাবস্থায় পাড়ার বৌদিরা  একটা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করতেন। তারা সেটা নিস্বার্থভাবে পালন করে দুই জনকে সাহায্য করতেন।  সেটা সব সফল  অসফল প্রেমের ক্ষেত্রেই দেখা যেত। অনেক সময় বৌদিদের বাড়িতে (দাদার অনুপস্থিতে) দুজনের সাক্ষাৎ হত এবং  সাক্ষাতে দুজনের তৃষিত হৃদয় জুড়াত। 

অনেক সময় বৌদির অভাবে অগত্যা প্রেমিকার মেয়ে বন্ধুর সাহায্যেও প্রেম-পত্রের আদানপ্রদান হত। এটা একটা বিপদজনক রাস্তা। কিন্তু কথায় বলে প্রেম বিপদ বোঝে না। ঊপায় না থাকলে সে বিপদে ভয় পায় না। একটা চিঠির জন্য তখন কি না করত। আজকাল সেসব কল্পনাও করতে পারবে না । কারন আজকাল আর তার প্রয়োজন হয় না। প্রেমপত্র জিনিসটা কি তাই বা কয়জন জানে। প্রেম পত্রের স্বাদ পাওয়া অনেক দুরের কথা।  প্রেম পত্র লেখার সময় অনেক ভাষার  প্রয়োগ হত যা আজকের  SMS, EMAIL ‘র ভাষায় সবই হারিয়ে গেছে। একটি পত্রের আশায় আশায় দিনের পর দিন কেটে যেত। চিঠি পেতে দেরি হলে কত অভিজ়োগ  আনুজোগ মান  অভিমান ভরা থাকতো পরের  চিঠিতে। এখন সে সব কোথায় ? এখন শুধু একটি বোতাম টেপার  অপেক্ষা। সঙ্গে সঙ্গে দুজনে কানেক্ট হয়ে যাচ্ছে। টেকণোলোজী আমাদের  দুরত্ত্ব কমিয়েছে এবং সেইসঙ্গে আমাদের সুক্ষ  অনুভুতিগুলোকে মুছে দিয়েছে। এই টেক্‌ণোলোজী আমাদের অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। এখন সব কিছুই এত সহজলভ্য যে তা পাওয়ার বা জানার যে আকুলতা বা বেদনা তা এখন অনুভুত হয় না বা অনুভব করার প্রয়োজন হয়  না।  প্রেমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখন  বিরহ বলে কিছু নেই। বিরহের মধ্যে যে সুখ তা হারিয়ে গেছে। INTERNET, MOBILE ‘র দৌলতে প্রেমের রুপ পালটে গেছে।  

আমরা উত্তম সুচিত্রা জুটির সিনেমা দেখে  অনুপ্রানিত হোতাম। পর্দায় উত্তম সুচিত্রার নির্মল প্রেম দেখে তখন প্রেমের পাঠ শুরু হত। সেগুলো তখন হৃদয় দিয়ে অনুভব করতাম এবং তরুন মনের কোনে রেখাপাত করতো। সমাজ বা পরিবার তখন এখনকার মত এতোটা উদার ছিল না , তাই  তখন প্রেমে বাধা বিপত্তি  অসুবিধা সবসময় থাকতো । এইসব কারনে দুজনের মধ্যে  সবসময় একটা  দুরত্ত্ব  থাকতো  এবং এই দুরত্বের কারনেই তখন প্রেমে গভীরতা ছিল । যা সহজে পাওয়া যায়না তা  পেলে সততই  মধুর হয়। তাই  সেদিনের সেই প্রেম ছিল মধুর এবং দীর্ঘস্থায়ী।