পঁচিশে বৈশাখ

আজ পঁচিশে বৈশাখ, কবিগুরুর 157 তম জন্মদিনে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।
———xxx——–
দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না–
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
কান্নাহাসির বাঁধন তারা সইল না–
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥
আমার প্রাণের গানের ভাষা
শিখবে তারা ছিল আশা–
উড়ে গেল, সকল কথা কইল না–
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥
স্বপন দেখি, যেন তারা কার আশে
ফেরে আমার ভাঙা খাঁচার চার পাশে–
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
এত বেদন হয় কি ফাঁকি।
ওরা কি সব ছায়ার পাখি।
আকাশ-পারে কিছুই কি গো বইল না–
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥

Advertisements

স্মৃতিকথা

দক্ষিণেশ্বরের কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথাতে লিখেছেনঃ

“সাংসারিক মনঃকষ্ট যাচ্ছিল, একদিন আপিসে যাব বলে বেড়িয়ে আর ইচ্ছা হলো না। গিয়ে কি ফল? তার চেয়ে ঠাকুরের কাছে যাই। রানী রাসমণির ঘাটে গিয়ে নামলুম। দেখতে পেলুম ঠাকুর তাঁর ঘরের পশ্চিম দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গাদর্শন করছেন। নিকটে উপস্থিত হতেইঃ

“কিরে – আপিস পালালি! ওটা ভাল নয়। তোরা কুমিরের মতো, জলের মধ্যে বা সংসারে হাঁপিয়ে উঠলে – শ্বাস নেবার তরে জলের ওপর নাক বাড়িয়ে কিছুক্ষণ থাকিস, আবার সে-কথা ভুলে গিয়ে ডুব মারিস – বেশিক্ষণ থাকতে পারিস না। দুঃখকষ্ট না থাকলে কি কেউ এদিক মাড়াতো! দুঃখকষ্ট বড় দরকারি জিনিস রে। সেই তো মানুষকে সৎপথ খোঁজায়। ভাগ্যবান পথ দেখতে পায়”।

(বিবাহ করেছি ও মা আছেন জেনে) শেষে বললেন, “যা এখন সংসার কর, একটু দুঃখকষ্ট থাকা ভাল, এগিয়ে দেয়। দুঃখ না থাকলে কেউ ভুলেও ভগবানের নাম নিত না”। হঠাৎ আমার মনে হলো তিনি যেন কষ্টবোধ করছেন। বললুম, “আপনি একটু বিশ্রাম করুন, … আমি বুঝিনি, জ্বালাতন করছি।”

“কষ্ট তো আছেই, কিছু জানার থাকে তো বল।” হাসতে হাসতে বললুম, “আমাদের তো সবই জানবার, জানলুম আর কি?”

“কেন, ভগবানকে জানবি, চেষ্টা থাকলেই পাবি। তিনি যখন রয়েছেন, পাবিনি কেন। ইচ্ছে প্রবল হলেই পাবি। সে ইচ্ছা আনা চাই!”
“আপনি আশীর্বাদ করুন।”

“ওসব আশীর্বাদের বস্তু নয়, নিজের কাজ – আকাঙ্খা বাড়া। বাড়ি যা।”
জিজ্ঞাসা কিছু থাকলে তিনি তখনো বলতে প্রস্তুত। কি জিজ্ঞাসা করব – তাই জানি না। তাঁকে ঘরে দিয়ে বাড়ি ফিরলুম”।

শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের কয়েক বছর পরে কেদারবাবুর মনে তীব্র অনুশোচনা দেখা দেয়। তিনি উদাসীর মতো ঘুরে বেড়াতেন। একদিন এক চলতি নৌকায় কলকাতায় যেতে রানী রাসমণির কালীবাড়ি চোখে পড়ল।

হঠাৎ ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, “ঠাকুর যদি আজ থাকতেন।”

বাগবাজারের ঘাটে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে নেমে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। পূর্বের এল শোনা কথা সহসা হৃদয়ে ধ্বনিত হলো, “কাঁকুড়গাছিতে ভক্ত রামদত্ত মহাশয়ের বাগানে ঠাকুরের সমাধি-মন্দির হয়েছে।” কেদারবাবু কাঁকুড়গাছি কোথায় সঠিক জানতেন না। শুধু জেনেছিলেন যে, রেললাইন পেরিয়ে নারকেলডাঙ্গার কাছে। তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। সেই একবার মাত্র রাসমণির বাগানের সামনে একপ্রকার অসম্বিতেই তাঁর প্রাণ বলে উঠেছিল, “ঠাকুর যদি আজ থাকতেন।” ঐ চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসল।

তাঁর আত্মকথাঃ
“রেল লেইন পার হয়ে আবার রাস্তা – তার দুধারে বাগানই বেশি। বসতবাটি বিরল। বেলা বোধ হয় দ্বিতীয় প্রহর, গ্রীষ্মকাল, রৌদ্র প্রচণ্ড – ঝাঁ ঝাঁ করছে। পথ প্রায় জনশূন্য। নিশ্চয়ই রামবাবুর সেই বাগান এইখানেই কোথাও হবে। কিন্তু কোথায়? আরো একটু এগুলাম। দক্ষিণে একটা গলিপথ কিছুদূর চলে গিয়েছে, প্রান্তে ফটক দেখা যাচ্ছে আর বাশঁঝাড়। গেট বন্ধ নয়, ভেজানো রয়েছে। একটু ঠেলতেই খুলে গেল। ঢুকে ভেজিয়ে দিলুম।

কিন্তু মন্দির কই – ঠাকুরের সমাধি-মন্দির? তবে কি এ-বাগান নয়? মন যে বলছে এই বাগানই। এগোতেই পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা একটা ছোট পুষ্করিণী। তার চারদিকে রাস্তা। পুষ্করিণীর পূর্ব পারে পশ্চিমমুখো একটি ছোট পাকা কুটুরী, চুনকাম করা। এইবার কুটুরীর দিকে সোজা-সুজি চাইলুম – দ্বার উন্মুক্ত। এ কি! ঠাকুর যে! প্রাণ আনন্দে আহা আহা করে উঠল। ধন্য ভক্ত, একেবারে যে জীবন্ত মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন! সেই প্রফুল্ল মুখ, সেই কাপড় – সেই তেমনি কাঁধে ফ্যালা। আবার দেখলুম – এ কি, হাওয়ায় দাড়ির দুই এক গাছি চুলও মৃদু মৃদু নড়ছে! আশ্চর্য! যেমনটি দেখেছি হুবহু সেই মূর্তি!”

তিন-চার মিনিট দর্শনের পর কেদারবাবু বাগানের উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে শুনতে পেলেন পূজারীর কণ্ঠস্বর, “কে গা আপনি?”
“ঠাকুরকে দেখছি। এইটিই কি রামদত্ত মশায়ের বাগান?” – এই বলে কেদারবাবু পূজারীর দিকে এগুলেন।
“কি দেখছিলেন – বললেন?”
“পরমহংসদেবের মূর্তি…!”
“মূর্তি? কোথায়? কি বলছেন?”
“কেন – ঘরের মধ্যে তবে…।”

“ঘর তো বন্ধ। চাবি এই আমার কাছে রয়েছে। ঘরের মধ্যে রূপার বাসন-কোসন রয়েছে… দেখবেন কি?… বড় জোর এক ঘন্টা হবে, পূজাদি সেরে ঘর বন্ধ করে খেতে গিয়েছিলুম। আপনি ওসব কি?…”

তখন উভয়ে ঠাকুর ঘরের সামনে এসে দেখেন, ঐ ঘরের পশ্চিম ও দক্ষিণ দ্বার উন্মুক্ত, আর ঘরের মধ্যে ঠাকুরের সেই প্রাণ জুড়ানো মূর্তির চিহ্নমাত্রও নেই। বিহ্বল কেদারবাবু একটু সামলে বললেন, “মশাই, আপনার জিনিসপত্রগুলো সব ঠিক আছে কিনা আগে দেখে নিন।”

পূজারীও অবাক হয়ে বললেন, “সেসব আমার সামনেই রয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু কয় বৎসর নিত্য এই কাজ করছি এমন ভুল তো কোনদিন ঘটেনি।”
পরে রামবাবুর বাগান কিনা প্রশ্নের উত্তরে পূজারী বললেন, “হ্যাঁ, তাঁরই যোগোদ্যান। আর এইটি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সমাধি-মন্দির। আচ্ছা, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? অনেকেই তো আসেন।… বাবুকে কি বলব?”
“বাবুকে বলবার দরকারই বা কি? এই তো বললেন কত লোক আসেন, আমিও সেইরূপ একজন। ঠাকুরের সমাধিক্ষেত্রে প্রণাম করে যাবার ইচ্ছায় এসেছিলুম।”

পূজারীর কাছে ঠাকুরের প্রসাদী ফল আর এক গ্লাস জল খেয়ে কেদারবাবু দেহমন শীতল করে দক্ষিণেশ্বরের পথে বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে বেরিয়েই একটি ঘোড়ার গাড়ি পেয়ে গেলেন। গাড়িতে বসে কেদারবাবু ঠাকুরের অপূর্ব লীলা চিন্তা করতে লাগলেনঃ

“আজ যখন নৌকা রানী রাসমণির মন্দির সম্মুখে, তখন তো আমার কোন চিন্তা, কোন জ্ঞানই ছিল না, কোথা হতে অবচেতনা সহসা সাড়া দিয়ে উঠল – ‘ঠাকুর যদি আজ থাকতেন?’ কেন যে এ-কথা (মনে) এসেছিল, কি অভাব বোধ হয়েছিল, তারও সুস্পষ্ট ধারণা আমার ছিল বলেও বোধ হয় না। এতটুকু ব্যাকুলতা কি কাতরতা তার মধ্যে গোপন ছিল কিনা – তাও তো জ্ঞানত বলতে পারি না। হে ভাবরূপী ভাবগ্রাহী অন্তর্যামী, তুমিই অন্তরে বসে ও-কথা বলিয়ে থাকবে, আবার অহেতুক কৃপাসিন্ধু, তুমিই ব্যবস্থা করে সে অভাব মেটালে! এ অভাগার প্রতি একি অনির্বচনীয় করুণা! ‘সাপ হয়ে কামড়াও রোজা হয়ে ঝাড়ো!’ এমন ব্যথার ব্যথী আর কে আছে? কোথায় পাব?”

আলমারি

আলমারি

নরেন্দ্রনাথ মিত্র
স্ত্রীর সঙ্গে রোজ ঝগড়া হয় পরিতোষ সরকারের। দামি কাপড়চোপড় রাখবার মতো একটা আলমারি নেই ঘরে। ট্রাঙ্কে সুটকেসে অতি কষ্টে জিনিসপত্র গুঁজে গুঁজে রাখতে হয়। একটা কিছু বার করতে হলে একেবারে লণ্ডভণ্ড, কুরুক্ষেত্র কাণ্ড। সুপ্রীতি বলে, “আমি আর পারব না তোমার ঘর গোছাতে। আর এই দামি দামি জিনিসগুলি যদি নষ্ট হয় তার জন্যেও আমাকে দায়ী করতে পারবে না।“ পরিতোষ নির্লিপ্ত থাকবার ভাণ করে বলে, “ বেশ, করব না দায়ী। সব দোষ তুমি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ো।” সুপ্রীতি রাগ করে বলে, “দোষ চাপালে আর কী হবে। গেলে আমার জিনিসই সব যাবে।”
তা ঠিক। বসনভূষণের ভাগ সুপ্রীতিরই চৌদ্দ আনা। পরিতোষের নিজস্ব বলতে আছে একটা গরদের পাঞ্জাবি, পৈত্রিক আমলের একখানি শাল। বিয়ের পাওয়া আংটি আর সোনার বোতাম। পরিতোষ কিছুতেই ব্যবহার করে না। ওর নাকি লজ্জা করে। তবে ঘড়ি আর পেনটি সঙ্গে সঙ্গেই রাখে। সুপ্রীতি খোঁচা দিয়ে বলে, “ও-সবও তো গয়না। ওগুলিও তো আমার বাবার দেওয়া জিনিস।”

পরিতোষ জবাব দেয়, “তোমার বাবার দেওয়া সব জিনিসের ওপরই যে আমার বিরাগ একথা, বলতে পার না। “ সুপ্রীতি বলে, “থাক থাক, আর রসিকতা করতে হবে না। তুমি যে কত ভালবাস আমাকে তা জানা আছে।”

বছর দশেক হল বিয়ে হয়েছে ওদের। তার এক বছর পর থেকেই এ ধশরনের খোঁটা শুনতে হচ্ছে পরিতোষকে। শুনতে শুনতে কান-সওয়া হয়ে গেছে।

কিন্তু পত্নীপ্রীতির যে নিদর্শন সুপ্রীতি স্বামীর কাছে চায় তা এনে দেওয়া তার পক্ষে দুঃসাধ্য। গ্লাস-বসানো ইস্পাতের আলমারির দাম অন্তত শ’তিনেক টাকা।

পরিতোষের দেড় মাসের মাইনে। বিমা কোম্পানির কেরানি যদি অমন নবাবি করে তার সংসার থেকে ছ’মাসের মধ্যে অভাব অনটন দূর হবে না। শুধু স্ত্রীর আবদার মেটালেই তো চলবে না পরিতোষকে। সংসারে পোষ্য অনেক। দুটি ছেলেমেয়ে হয়েছে। একটি বোন কলেজে পড়ে। ভাইটিও সামনেবার স্কুলের গণ্ডি ছাড়বে। খরচ কি কম! পরিতোষ যুক্তি দেখায়, “ তা ছাড়া অমন দামি আর ভারি জিনিস ভাড়াটে বাড়িতে এনে রাখতে নেই। টানাটানিতে কম হাঙ্গামা-হুজ্জোত পোহাতে হয়? কোথায় কখন থাকি তার কি কিছু ঠিক আছে? আমাদের তো সারা শহর ভরে বাসঘর আর বাসরঘর ছড়ানো। আজ বেলেঘাটা—কাল পাথুরেঘাটা, আজ টালা, কাল টালিগঞ্জ। একটু স্থিত হয়ে বসে নিই—।”

সুপ্রীতি বলে, “হুঁ, কবে তুমি চৌরঙ্গিতে বাড়ি করবে তারপর সব ফার্নিচার আসবে, সেই ভরসাতেই থাকি।” দু-চারদিন যায়, আর সুপ্রীতি সেই আলমারির কথা তোলে। বলে , “ আজও গিয়েছিলাম বিডন রোয়ে সুচিরাদের বাড়ি। কী চমৎকার আলমারিই না কিনেছে। শাড়ি রাখ, গরম কাপড়চোপড় রাখ, সব ব্যাপারেই সুবিধে। গয়নাগাঁটিও বেশ নিশ্চিন্তে রাখা যায়। কেউ খুলে নিয়ে যাবে এমন সাধ্য নেই।

অনেকগুলি ড্রয়ার। যেটায় যা খশি রাখ। তারপরে গ্লাস সেট করা আছে। তুমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তার সামনে বসে দিব্যি দাড়ি কামাতে পারবে।” পরিতোষ চোখ কপালে তুলে বলে, “ওরে বাবা। ওই আলমারি যদি একবার কিনে বসি তাহলে কি সারা জীবনের মধ্যে আমার ব্লেড কেনার পয়সা জুটবে?”

সুপ্রীতি রাগ করে পাশ ফিরে শুতে শুতে বলে, না জোটাই উচিত। তুমি দাড়ি গোঁফ রেখে বনে চলে যাও। বিয়ে করাই তোমার ভুল হয়েছিওল।”

পরিতোষ স্বীকার করে বলে, “ভুলটা বড় পরে ধরা পড়েছে। এখন আর শোধরাবার জো নেই। কিন্তু তুমি বোধ হয় এহনও শোধরাতে পার। সুচিরাদের বাড়িতে কিছুদিন যাতায়াত বন্ধ করে দাও। তাহলে জিনিসটা তোমার চোখেও পড়বে না। মনও খারাপ হবে না।” সুচিরা দত্ত কলেজে বছর দুই সুপ্রীতির সহিপাঠিনী ছিল। বড় ডাক্তারের মেয়ে মেজো ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

সে-রাত্রে সুপ্রীতি পরিতোষের সঙ্গে কিছুতেই কথা বলল না। তাতে পরিতোষ যে খুব চিন্তিত হল তা নয়। এমন মান ভঞ্জনের পালা দাম্পত্য-জীবনে ঘুরে ফিরে আসে। না আসলেই বরং জীবন একঘেয়ে হয়ে যায়। কিন্তু দিন দুই বাদে এক কাণ্ড ঘটল তাতে পরিতোষ আর অত অবিচলিত থাকতে পারল না। অফিস থেকে ফিরে ঘরে এসে ঢুকতে না ঢুকতেই ছোট বোন অঞ্জলি আর ছোট ভাই রন্টু একসঙ্গে এসে খবর দিল, “দাদা, সর্বনাশ হয়েছে।”

পরিতোষ উদ্বিঘ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কো হয়েছে রে? খোকন আর বুড়ি কোথায়? কোন অ্যাক্সিডেন্ট?” অঞ্জলি আশ্বাস দিয়ে বলল যে, সে সব কিছু নয়। পরিতোষের ছেলেমেয়ে দুটি ভালই আছে। কিন্তু সর্বনাশ হয়েছে তার স্ত্রীর। ট্রাঙ্কের ভিতরে পোকা ঢুকে বেনারসি আর মুর্শিদাবাদি সিল্ক দু’খনাই কেটে ফেলেছে। ঘরের দিকে ভাল করে তাকিয়েই ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার বুঝতে পারল পরিতোষ। সারা ঘরময় সুপ্রীতির পোশাকি শাড়িগুলি ছড়ানো। পুজোর সময় আর বিবাহবার্ষিকীতে পঁচিশ ত্রিশ টাকার যে সব শাড়ি পরিতোষ স্ত্রীকে উপহার দিয়েছে সব মেঝেয় লুটোতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আর পাশের ঘরে তক্তপোষের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে সুপ্রীতি। এক পাশে কীটদষ্ট বেনারসিখানা পড়ে রয়েছে। দোরের কাছে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে খোকন আর বুড়ি। পরিতোষের সাত আর পাঁচ বছরের দুটি পুত্রকন্যা। পরিতোষ স্ত্রীর পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলল, “বোধহয় এখনও রিপু করিয়ে নিলে চলবে। আর অন্য শাড়িগুলিও বাক্সে তুলে রাখ। নষ্ট করে লাভ কী।”

সুপ্রীতি বলল, “তুলে আর কী হবে। ওই ভাঙা বাক্সে তুলে রাখাও যা, বাইরে ফেলে দেওয়াও তাই। একই কথা। আমার কিছু আর রাখবার দরকার নেই। তুমি রাখতে হয় রাখো।” শেষ পর্যন্ত পরিতোষ প্রতিশ্রুতি দিল, এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রীতির পছন্দমতো আলমারি সে কিনে আনবে। একই সঙ্গে যা মজবুত আর শৌখিন। বড় আয়না-বসানো আলমারি। পাশাপাশি দাঁড়ালে, দু’জনের প্রতিচ্ছবি যাতে ফুটে উঠবে। ঘরে একখানা বড় আয়না না থাকলে কি চলে। আয়্নায় তো শুধু মুখই দেখা যায় না, সুখও দেখা যায়। দু’খানা সুখী পরিতৃপ্ত মুখের প্রতিবিম্ব। তার চেয়ে বড় ঐশ্বর্য আর কী আছে।

আলমারি তো কিনবে। কিন্তু তিনশো সাড়ে তিনশো টাকা কোত্থেকে জোগাড় করবে পরিতোষ। হাজার দুই টাকার ইন্সিওরেন্স আছে। তার থেকে…ধার নেওয়া যায়। কিন্তু সুপ্রীতি বলল, ‘ খবরদার ও টাকায় তুমি হাত দিতে পারবে না।”

ব্যাঙ্কে একটা নামমাত্র একাউন্ট আছে। সর্বসাকুল্যে তাতে শখানেক টাকাও হবে ক না সন্দেহ। পরিতোষ বলল, “নিজেদের আলমারি্ত আনতে গিয়ে কি পরের সিদুকে হাত দেব?”

সুপ্রীতি বলল, “কে তা দিতে বলেছে? দরকার নেই এখন কিনে? পুজোর সময় যদি বোনাস টোনাস পাও তখন দেখা যাবে।”

কিন্তু পরিতোষের মনটা খুঁত খুঁত করতে থাকে। কথা যতদিন দেয়নি ততদিন একরকম ছিল। কিন্তু কথা দেওয়ার পর জিনিসটা কিনে না আনতে পারলে স্ত্রীর কাছে আর মান থাকে না। সুপ্রীতি তাহলে ভাববে পরিতোষ একেবারেই পথের ফকির। এত বড় শহরে তিনশো সাড়ে তিনশো টাকা সংগ্রহ করে আনার মতো ক্ষমতাই নেই তার।

সুতরাং পরিতোষ ধারের চেষ্টায় নামল। ক্রেডিট মানে কৃতিত্ব। যার যত ধার বেশি, তার বুদ্ধির ধার তত অসামান্য। গোপনে দুওজন সহকর্মী অফিসারের কাছ থেকে শ’খানেক টাকা নিল। পুরনো সহপাঠীদের মধ্যে একজন ইটের কারবার করে। টোকা দিয়ে দেখল সুরথের হৃদয় অতখানি শক্ত হয়ে যায়নি। জরুরি দরকার এবং অসুখবিসুখের দোহাই দেওয়ায় সে শ’দুইই টাকা দিল। বাকি পঞ্চাশ টাকা তুলল নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে। মনটা তবু খুত খুত করতে লাগল, কোথায় যেন হীনমন্যতা আছে এই ধার করার মধ্যে। বন্ধুদের কাছে হাত পাততে গেলে যে হতমান হতে হয় তাতে পরিতোষের কোনও সন্দেহ নেই।
টাকা জোগাড় হওয়ার পর সেদিন বিকাল বেলায় স্ত্রীকে নিয়ে যখন জিনিস কিনতে বেরুল তখন মনে আর তেমন গ্লানি রইল না পরিতোষের। এই উপলক্ষে সে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। সুপ্রীতির নিষেধ সত্বেও শ্যামবাজার থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে চলল বরবাজারের দিকে। পথে স্ত্রীকে নিয়ে ভাল একটা রেস্টুরেন্টে খেল। সুপ্রীতি হেসে বলল, “জিনিসটা আগে কেনা হোক। পথেই যদি এত টাকা উড়িয়ে দাও তাহলে জিনিসটা কিনবে কী করে।”

পরিতোষ বলল, “বিশ্বাস কর, এই টাকা ক’টা ওড়াবার শক্তি আমার আছে।”

সুপ্রীতি বলল, “কিন্তু কেন এত ব্যয় করছ শুনি। আজ তো আমার ম্যারেজ ডে অ্যানিভারসারি নয়, কি অন্য কোন উৎসব-টুৎসব নয়।”

পরিতোষ বলল, “আজ আলমারির জন্মোৎসব। আর সে আলমারি শুধু ইস্পাত দিয়ে তৈরি নয়, আমাদের দু’জনের আনন্দ দিয়ে তৈরি।”

সুপ্রীতি বলল, “থাক, কবিত্ব রাখ। ফুলটুল কেনার সময় ওরকম কবিত্ব মানায়।”

পরিতোষ প্রতিবাদ করল, “আর আলমারির বেলায় বুঝি কবিত্ব বেমানান? আজকালকার কবিদের ও ধরনের পক্ষপাত নেই।”নেতাজী রোডে গাড়িটাকে জোর করে ছাড়িয়ে দিল সুপ্রীতি। বলল, “আর মিটার বাড়িয়ে লাভ নেই। এবার হেঁটে হেঁটে দেখতে দেখতে চল।”

পরিতোষ বলল, “ অন্য জিনিস দেখব কী। তোমাকে দেখেই কূল পাইনে।”

সুপ্রীতি মুখ টিপে হেসে বলল, “সত্যি?”

পরিতোষ বলল, সত্যি ছাড়া আর কী। এমন সাজ সেজে এসেছ যে চেনাই যায় না।”

সুপ্রীতি খুশি হয়ে বলল, “বাড়াবাড়ি কোরো না।”

ওরা প্রথমে নামজাদা দোকানের দামি জিনিসগুলি দেখতে লাগল। জিনিস দেখে চোখ লুব্ধ হয়, কিন্তু দাম শুনে সেই চোখই আবার কপালে ওঠে। সুপ্রীতি বলল, “অত দামি জিনিস কেনার দরকার নেই। তা ছাড়া দেখেনি আরও পাঁচটা দোকান। এত দামের জিনিস নেব, যাচাই করে নেব না?”

দেখতে দেখতে ওরা অপেক্ষাকৃত ছোট একটা দোকানে উঠল। চন্দ এন্ড কোম্পানি। কয়েকটা আলমারি ভালই দেখা গেল। বড় দোকানের অনুকরণে তৈরি হলেও জিনিস খারাপ নয়, দেখতেও বেশ সুন্দর। সেলসম্যান দাম বলল, আড়াইশো। আশ্চর্য, সুচিরার ঘরে যা দেখে এসেছে সুপ্রীতি, অবিকল সেই রকম। শুধু কোম্পানির নাম আলাদা। কত বেশি কমিশন চন্দ এন্ড কোম্পানি দিতে পারবেন তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে হঠাৎ পিছনের অফিস রুম থেকে স্যুটপরা সুদর্শন এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশের বেশি নয়। ছিমছাম শৌখিন পুরুষ।

সুপ্রীতি তার দিকে চেয়ে একটুকাল অবাক হয়ে থেকে বলল, “ নির্মলদা তুমি এখানে?”

সেলসম্যান বলল, “ আমাদের বড়বাবু মিঃ চন্দ। ওঁদেরই তো কোম্পানি।”

সুপ্রিটি খুশিহয়ে বলল, “তাই বল!”

নির্মল বলল, “এবার আমি জিজ্ঞেস করছি, তুমি এখানে!”

সুপ্রীতি বলল, “আলমারি কিনতে। কিন্তু বড্ড বেশি দাম তোমাদের দোকানে।“

নির্মল স্মিতমুখে বলল, “ তা দাম তো একটু বেশি হবেই। জিনিস নেবে দাম দেবে না?”

নির্মল নিজেই যেচে পরিচয় করল পরিতোষের সঙ্গে। নিজেরও পরিচয় দিল। বলল, “সুপ্রীতি আমাদের অঙ্কের প্রফেসরের মেয়ে। অঙ্কের চেয়ে বেশি ভয় করতাম ওকে। এত উৎপাত করত। রাজসাহী শহর সুদ্ধ লোক ওর জ্বালায় অস্থির ছিল।”

জ্বালাটা কী রকমের, অস্থিরতাই বা কী ধরনের তা পরিতোষ নির্মলের মুখের দিকে চেয়ে অনুমান করার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠল না। নির্মলের মুখে হাসি, চোখে চাতুর্য। চেহারায় আভিজাত্য।

খানিকক্ষণ ধরে কুশল প্রশ্নের বিনিময় চলল। পরিতোষের কানে কয়েকটি অশ্রুতপূর্ব সর্বনাম। যে সঙ্কেত ভেদ করবার চাবি তার কাছে নেই। তারপর নির্মল জজ্ঞাসা করল, “কোন আলমারিটা তোমার পছন্দ তাই বল।” সুপ্রীতি উল্লাসের সুরে বলল, “পছন্দ তো সবগুলিই।”

নির্মল বলল, “বেশ তো সবই নাও। পাইকারি দরে দিতে পারব।”

পরিতোষ হাতঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “ আমার একটু তাড়া আছে। একটা আলমারিই নেব আমরা।”

নির্মল বলল, “বেশ তো।” কিন্তু মুশকিলের কথা হল, নির্মল কিছুতেই দাম নেবে না। সুপ্রীতি দামের কথা বলায় হেসেই উড়িয়ে দিল নির্মল। ধমকও দিল দুটো-একটা। পরিতোষের দিকে চেয়ে বলল, “ ওর বিয়ের সময় দেশে ছিলাম না। তখন কিছুই প্রেজেন্ট করতে পারিনি। আজ এটা ওকে দিলাম।”

সুপ্রীতি বলল, “না না সে কি হয়।”

নির্মল বলল, “ না হয় তোমার মাসিমার কাছে দাম দিয়ে এসো। আমি নিতে পারব না।” মাসিমা মানে নির্মলের মা। তিনি আজও বেঁচে আছেন। শেষ পর্যন্ত আলমারিটা বিনামূল্যেই সুপ্রীতিকে গছিয়ে দিল নির্মল। সুপ্রীতি একান্তে স্বামীকে বলল, “আচ্ছা দামটা আমরা অন্যভাবে শোধ করে দেব।”

পরিতোষ নিঃশব্দে রাস্তায় নেমে এল। ধার-করা টাকাগুলি এবার অনায়াসে শোধ দিতে পারবে। কিন্তু অত বড় আলমারিটা যে ঘরজুড়ে থাকবে তাকে ভুলবে কী করে?
রচনাকাল : জুলাই ১৯৫৬

মানুষ

সাদাত হোসাইন

তখন ‘পানি’কে ‘জল’ বললেই পিঠের উপর দুমদাম পড়তো।

এটা আম্মার ইসলামি আদব লেহাজ শেখানোর অংশ ছিল। সাথে ছিল বাজখাঁই গলায় বকুনি, ‘মোসলমানের পোলা হইয়া পানিরে কস্ জল, ছি ছি ছি। এই হাতের গেলাসের পানি ফেলা। এই পানি এহন আর হালাল নাই, ফেলা, ফেলা। বিসমিল্লাহ বইলা আবার পানি নে। তারপর মাটিতে বইসা আদবের সাথে তিন ঢোক দিয়া খা, তিন ঢোকে সব পানি খাবি। এক ঢোকে না। এক ঢোকে পানি খায় শয়তানে’।

আমি গ্লাসের পানি ফেলে দিয়ে আবার পানি নিয়ে মাটিতে বসে আদবের সাথে গ্লাসে চুমুক দিতে যাবো, অমনি আম্মার জোর চিৎকার, ‘পানি খাওনের দোয়া পরছস? জানোস দোয়া? দোয়া পড়, দোয়া পড়’।

– ‘দোয়াতো ভুইলা গেছি আম্মা!’

– ‘কি! দোয়া ভুইলা গেছস!! কই নিবি আমারে? কই? দোজখে? অক্ষন দোয়া মুখস্ত কর, অক্ষন, বল, অসাকা হুম রব্বাহুম সরাবান তহুরা’। পড়, মুখস্ত কর, মুখস্ত কইরা তারপর এইখান থেইকা উঠবি’।

আমি গভীর মনোযোগ এবং খানিক আগে দোয়া ভুলে যাওয়ার ভয় নিয়ে দোয়া মুখস্ত করতে বসে গেলাম। অসাকা হুম রব্বা হুম সরাবন তহুরা।

এই দৃশ্য কেবল আমার একার না। কমবেশি সেই সময়ের আমাদের সবারই। আমরা তখন ভুলেও পানিকে জল বলি না। বরং বিলের পানিতে ফুটফুটে শাপলা ফুলের মধ্যেও তখন হিন্দু শাপলা আর মুসলমান শাপলা খুঁজি! চিকন চাকন দেখতে কট কটা লাল রঙের শাপলাগুলো হোল হিন্দু শাপলা। আর ধবধবে সাদা রঙের মোটা তাজা শাপলাগুলো মুসলমান শাপলা। আমরা বেছে বেছে সাদা শাপলাগুলো তুলে আনি। সেকালে গ্রামের মানুষদের বিনা পয়সায় পেটে জামিন দেয়ার নানান রকম ফন্দি ফিকির খুঁজতে হতো। সেক্ষেত্রে তরকারি হিসেবে শাপলা ছিল অপ্রতিদ্বন্ধি। চিংড়ির সাথে শাপলার ঝোল কিংবা ভাজির স্বাদ এখনো চোখ বুজলেই জিভের ডগায় লেপটে থেকে চাগিয়ে ওঠে! আহা!

কে শিখিয়েছে, কিংবা কিভাবে শিখিয়েছে জানি না। তবে এই হিন্দু মুসলমান বিভাজন খুঁজতাম সবকিছুতেই। হিন্দুদের আমরা বলতাম ‘নোমো’। এই নোমোদের সবকিছুই খারাপ। আমাদের কাছে ‘নোমো’ মানেই খারাপ। যেন একটা গালি! এরা পরিত্যাজ্য। কেবল চুল কাটাতে বিপুল নাপিত ‘নোমো’ হলেও তার কাছে যাওয়া যাবে, আর দা কুড়াল ধার দিতে শিতেশ কম্মকার! আমরা বাচ্চারাও এই বিভাজন সবক্ষেত্রেই মেনে চলতাম। কঠোরভাবে মেনে চলতাম। এমনকি আর সব পিঁপড়ার মধ্যে থেকেও ছোট ছোট লাল পিঁপড়েগুলোকে বেছে বেছে আঙুলের ডগায় পিষে দিতাম। যা বাবা! একটা ‘নোমো’ পিঁপড়াতো গেল!

‘নোমো’দের সব জিনিসকে খারাপ ভেবে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চললেও চৈত্র মাস এলেই কেমন গাঁইগুঁই করা শুরু করতাম। আম্মার কাছে গিয়া বলতাম, ‘আপনে যে কন হিন্দুদের সব কিছুই খারাপ, এই কথা কিন্তু সত্য না’।

– ‘কিভাবে সত্য না?’

– ‘এই যে দেখেন আদর্শলিপি নামে যে বই আছে, সেই বই ভর্তি ভালো ভালো লেখা, এই বই কে লিখছে? লিখছে, সীতানাথ বসাক। সে কি হিন্দু? না মুসলমান? সে কিন্তু হিন্দু। দেখছেন কি ভালো ভালো কথা লেখছে!’

আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ কটমট করে বললেন, ‘আসল উদ্দেশ্য কি সেইটা বল’।

আমি উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। সেখানে বিশাল শিমুল গাছের মাথায় লাল শিমুল ফুলগুলো পরিণত হয়ে বড় বড় ফল হয়েছে। সেই শিমুল ফলের ভিতরেই শিমুল তুলা। বাজারে সেই শিমুল তুলার দাম মাশাল্লাহ ভালো। আমি কিছু তুলা এর মধ্যেই বিভিন্ন গাছ থেকে চুরি টুরি করে জমিয়ে রেখেছি। আরও কিছু তুলা জমাতে পারলেই কেল্লা ফতে। সময় আর বেশি বাকি নাই। আরতো মাত্র ক’টা দিন। তারপরেই…!

আম্মা আবার জিজ্ঞাস করেন, ‘কিরে, মতলব কি?’

আমি উদাস গলায় জবাব দেই, ‘মতলব কিছু না’।

আম্মা হঠাৎ কড়ে আঙুলে মাস গোনেন আশ্বিন, কার্তিক… চৈত্র… বৈশাখ…! হ্যা, বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের মাস!

তারপর হঠাৎ শক্ত হাতে আমার কান চেপে ধরেন, ‘ওরে আল্লাহ! তুই এইবারও গোলোইয়ায় যাবি! গোলোইয়ায় যাবি! তোর সাহসতো কম না’! আমি নির্বিকারভাবে বলি, ‘সবাইতো যায় আম্মা, আমি গেলে কি হইছে?’

আম্মা বলেন, ‘গুনা হইব বাজান, এই সব মেলা ফেলায় যাওন ভালো না। ওইখানে পূজা হইব, নাচ গান হইব, ওইখানে যায় না বাজান’।

কিন্তু আম্মা জানেন, তিনি ‘গোলোইয়ায়’ যাওয়া থেকে আমাকে ফেরাতে পারবেন না। আমি যাবোই। আমাদের অঞ্চলে তখন বাংলা নববর্ষে বিশাল বৈশাখী মেলা হতো। গৌরনদী অঞ্চলের এই বিশাল মেলাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো গোলোইয়া। এই গোলোইয়া নিয়ে তখন আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সে কি উন্মাদনা! উত্তেজনা! কৌতূহল! সেই মেলায় যাত্রাপালা হয়, পালাগান হয়, পূজা হয়! কি সুন্দর সব প্রতিমা! কিন্তু হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার সেই মেলা তখন যেন আর আমার মতো মুসলমান পরিবারের কাছে বাঙ্গালী সংস্কৃতি নয়, যেন শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির উপলক্ষ্য। আমাদের তাই সেখানে যাওয়া বারণ! আমি ঘরের কোণায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি! আর জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, ইশ! কত মানুষ রঙবেরঙের জামা পড়ে গোলোইয়ায় যাচ্ছে! কতো কতো মানুষ গোলোইয়া থেকে ফিরছে! ইশ! তাদের হাত ভর্তি কত কত খেলনা! কতো কতো জিলিপি, সন্দেশ, মুড়িমুড়কি, নাড়ু, বাতাসা! ইশ!!

রঙের পসরা মেলে বসা সেই মেলা যেন বর্ণীল জীবনের সবটুকু রঙ। আমার মতো কিশোরের কাছে সেই রঙ তখন স্বপ্নের দেশ! রূপকথার জগত! সেখানে হিন্দু-মুসলমান, পাপ-পুণ্য কিংবা ন্যায়- অন্যায়ের বোধ তখন নিতান্তই গৌণ। আমরা উন্মুখ হয়ে থাকি গোলোইয়া শুরুর মাস তিনেক আগে থেকেই। কি কি কিনবো মনে মনে তার তালিকা করি। উশখুশ করি। নানান ফন্দি ফিকির করি, প্ল্যান-পরিকল্পনা করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টাকা কই পাবো? টাকা? আম্মাতো যেতেই দিবেন না। টাকা দেয়াতো অনেক দূরের কথা! যেতে হলেও যেতে হবে আম্মাকে না বলে। পালিয়ে। কিন্তু টাকা কোথায় পাবো?

টাকার ব্যাবস্থাও অবশ্য আমাদের আছে। আমরা গাছে গাছে পেকে যাওয়া শিমুল তুলো চুরি করে শিমুল তুলো জমাই। লুকিয়ে লুকিয়ে রোদে শুকাতে দেই। ভেজা তুলা কেউ কেনে না। প্রতিদিন আম্মার চোখ লুকিয়ে সেই তুলা রোদে শুকাই, আবার নিজের গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখি। দিনে দিনে একটু একটু করে ওজন বাড়ে। আজ-কাল-পরশু। প্রতিদিন ওজন মেপে দেখি! ইশ! যদি এক কেজী হতো! তাহলে কত দাম পাবো? তিরিশ টাকা? নাকি চল্লিশ? ভাগ্য ভালো হলে পঞ্চাশও পেয়ে যেতে পারি!
পঞ্চাশ টাকায় কি কি পাওয়া যায়?

আমি সেবার এক কেজির মতো তুলার ব্যাবস্থা করে ফেললাম!সত্যি সত্যি এক কেজী! রাতে আমার ঘুম হয় না! ছটফট লাগে! দমবন্ধ লাগে উত্তেজনায়, আনন্দে! টেনশনে! ইশ! এক কেজী! কি কি কিনবো? লাল নীল চরকী, লম্বা বাঁশি, চশমা, বাতাসা… আমার আর সময় কাটে না। রাত ভোর হয় না, ভোর হলে দুপুর হয় না। সন্ধ্যা হলে রাত হয় না। গোলোইয়ার দিন আর আসে না, আসে না।

গোলোইয়ার দিন দুপুরে শুকনো ক্ষেতের আইল ধরে হাটা দেই। নদী পেড়িয়ে গৌরনদী হেঁটে যেতে যেতে ঘণ্টাখানেক লাগবে। আমি জোর কদমে হাটি। গা বেয়ে ঘামের স্রোত নামে। কিন্তু বুকের ভেতর উচ্ছ্বাস! আরতো কিছুক্ষন! তারপরই সেই গোলোইয়া! সেই মেলা! আমি মাথা নিচু করে হাতের তুলার বস্তাটা দেখি! বুকের ভেতর প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটায়। নানান রঙের প্রজাপতি। লাল, নীল, হলুদ! ওরা বুকের ভেতর রঙ ছড়িয়ে পাখা ঝাপটায়।

আজ রঙের দিন!

খেয়া নৌকায় নদী পার হবো। নৌকা ভর্তি গিজগিজে মানুষ। আমি কোন মতে গুটিসুটি মেরে নৌকার পাটাতনে উঠে পড়ি। তুলোর বস্তাটা বুকের সাথে চেপে ধরি। গোলোইয়ায় যাওয়া মানুষের ভিড়ে নৌকাটা টইটুম্বুর। তিল ঠাঁই আর নাহিরে অবস্থা। নৌকাটা হঠাৎ বাঁ পাশে কাত হয়ে পড়ে। কাত হয়ে পড়ে। আমি প্রাণপণে পাটাতনের কাঠ আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না। টুপ করে পড়ে যাই জলের ভেতর। আমি এক না। আরও অনেকেই। কিন্তু তাদের আমি দেখি না। সেই বুক সমান জলে দাঁড়িয়ে আমি সেই তুলার বস্তাটা জলের ভেতর থেকে টেনে বের করি! অতো হালকা বস্তাটা জলের ভেতর এতো ভারী হয়ে আছে যে আমি আর টেনে তুলতে পারি না! আমার চোখের ভেতর জ্বালা করে ওঠে। টুপটুপ করে ক’ফোটা চোখের জল সেই নদীর পানিতে মিশে যায়।

কি অদ্ভুত! কান্নার জল নদীর জল থেকে আলাদা করা যায় না।

পরিশিষ্টঃ ——————-

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে।

সেই ভেজা তুলার বস্তা নিয়ে আমি বসে আছি সেই নদীর পাশেই ক্ষেতের মাঝে এক বাঁশবাগানের ভেতর। বাশবাগানের পাশের হিন্দু বাড়িটা থেকে উলুধ্বনির শব্দ আসছে! আমার ভয় লাগছে। চোখের কোলে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। তবুও আমি সেই অন্ধকারে বসে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি আর কাঁদি! অন্ধকার আরও গভীর হয়, আমি কাঁদতেই থাকি! কাঁদতেই থাকি। হঠাৎ সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কেরোসিনের কুপি হাতে কেউ একজন এগিয়ে আসেন। তার সিঁথিতে সিঁদুর। এক ‘নোমো’ মহিলা। তিনি এসে পরম মমতায় আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কি হইছে তোমার? কান্দ ক্যান?’

আমি জবাব দেই না। কাঁদতেই থাকি। তিনি তার কুপির আলোয় আমার পাশে পড়ে থাকা ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া তুলোর বস্তাটা দেখেন। তাকে আমি কিছু বলি না। কিন্তু তিনি যেন সব বুঝে যান। তিনি চুপচাপ আমার পাশে এসে বসেন, ‘তোমাগো বাড়ি কই বাপ? কইত্থেইকা আইছ? মেলায় আইছিলা? বাড়িতে বইলা আসো নাই? খাইছ কিছু? আসো আমার লগে আসো, বাড়ির ভিতর আসো’।

আমি তার কোন প্রশ্নের জবাব দেই না। কিন্তু তার পিছু পিছু বাড়ির ভেতর যাই। আমার কেন যেন ভয় করে না। এতো দিন লালন করে আসা ‘নোমো’ দের প্রতি কোন বিতৃষ্ণাও কাজ করে না। আমার কেবল মনে হয়, এই মানুষটা আমার চেনা। বহু দিনের চেনা।

পরদিন ভোরে পাগলপ্রায় আম্মা এসে হাজির। তিনি কিভাবে খবর পেয়েছেন কে জানে! আমাকে জড়িয়ে ধরে উথাল পাথাল কান্না। সিঁথিতে সিঁদুর আঁকা সেই ‘নোমো’ মহিলাটিকে ধরেও। তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে আম্মা কাঁদেন! সেই কান্নায় ধুয়ে মুছে যায় এতো এতো বছর, এতো এতো দিন, এতো এতো মুহূর্ত ধরে গড়ে তোলা বিভেদের দেয়াল! হিন্দু আর মুসলমান! মিলেমিশে এক হয়ে যায় অদ্ভুত ভালোবাসায়, বিশ্বাসে, অনুভূতিতে, কান্নায়! আমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখি। আমার হাতে তখন লাল-নীল-হলুদ রঙের চরকি, লম্বা বাঁশি, প্ল্যাস্টিকের চশমা, হাতের ভেতর পলিথিনে মোড়া নারকেলের নাড়ু, ধবধবে সাদা বাতাসা।

ওই সিঁদুর পড়া মহিলাটা আমাকে কিনে দিয়েছেন। আমি হঠাৎ আমার মায়ের সাথে আর ওই সিঁদুর পড়া মানুষটার সাথে আর কোন তফাৎ খুঁজে পাই না। লাল পিঁপড়া আর কালো পিপড়াতেও না। লাল শাপলা আর সাদা শাপলাতেও না, জল আর পানিতেও না। আমি কোন তফাৎ খুঁজে পাই না।

তফাৎ খুঁজে পাই না এই মানুষ দুজনের মধ্যেও। সেই সিঁদুর পড়া হিন্দু মমতাময়ী নারী আর আমার মায়ের ভেতর আলাদা করে কিছু খুঁজে পাই না আমি! কিচ্ছু না! শুধু খুঁজে পাই দুজন মানুষ! দুজন নারী।
দুজন মমতাময়ী মা।

সাদাত হোসাইন

সৌ: সঞ্জীব চক্রবর্তী।(ভায়া ফেসবুক)

English failed

|। *ইংরাজি ফেল*।|

ইংরাজিতেই সব লেখো ভাই, বাংলা ভাষা ঘোড়ার ডিম,
বাংলা থেকে বাংলা হটাও, এটাই স্লোগান , অতঃকিম!
বাংলাতে সব বললে করো ‘ *মুখ্যু* ‘বলে মশকরা,
সবকথাদের যায়না মোটেই ইংরাজিতে বশ করা।
ভুরু কুঁচকে দেখছো কেন? ভাবছো এসব কারসাজি?
দিলাম তবে শব্দ কিছু, ফেল যেখানে ইংরাজি।

‘ *গেঁড়ে*’ কিংবা ‘ *উদো* ‘বলে ডাকে যদি কেউ তোমায়
বাঙালী ঠিক বুঝে যাবে সেইকথাতে কি বোঝায় |
‘ *মায়ের ভোগে*’ যাওয়ার মানে ইংরেজ কি আর জানে !!
ঘাবড়ে যাবে বললে ‘ *মদন’ কিংবা ‘ *আতাক্যালানে* ‘।
ইংরাজিতে যায়না বলা ‘ *ধ্যাত্তেরিকা’, ‘ *আব্বুলিশ*,’
পারিস যদি ‘ *লে হালুয়া*’ ইংরাজিতে বদলে দিস।
আমরা জানি *হুমদো* কিংবা *মেনিমুখো* মানে কি,
‘ *দামড়া*’ কথার হদিশ আছে ইংরেজদের জ্ঞানে কি?
‘ *মাইরি*’ বলে দিব্যি খাওয়া ,ইংলিশে কি বল দেখি
‘ *ক্যাওড়ামো* ‘বা ‘ *ছ্যাঁচড়ামোটা*’ সাহেবসুবো বুঝবে কি?
‘ *পিন্ডি* যদি চটকে দিলাম’ ইংরাজি তার কি হবে?
‘ *চিমশেপড়ার*’ খুঁজতে মানে ডিকশনারি দৌড়বে।

আচ্ছা ছাড়ো , এসব নাহয় কথ্য ভাষায় বাক্যালাপ,
এসব কথা ভাববে কেন, তোমার গায়ে সভ্য ছাপ !!
‘ *সোহাগ* ‘ কথার ইংরাজি কি বলতে পারো খুব ভেবেও?
‘ *ন্যাকামি*’ ঠিক কাকে বলে, সাহেব খুঁজে জানতে চেয়ো।
ইংরাজি তাই থাকুক মাথায়, বাংলা -বুকের মধ্যে বাঁচে,
‘ *অভিমান*’ এর ইংরাজিটা পাইনি খুঁজে কারো কাছে ||

*(সংগৃহীত )*