রবিন্দ জনতি

রবিন্দ জন্তি

বলাই দাস
———————————

— দাদ্দু, আমরা এলাম ।
— তোমরা কারা , বাবারা ? কেনইবা এলে ?
— আমরা পাড়ার সান্সকিতিক কম্মি । এলাম আপনাকে ইনভাইট কত্তে ।
— তাহলে ঐ মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছ কেন ?
— আরে , এই নভেল কবির জন্যেই তো এলাম । কটা সেলফি নেব না ওনার সাতে ? আমরা কাল পাড়ায় রবীন্দজন্তি করচি ।
— সেটা কী বস্তু ?
— রবীন্দনাথের ‘হ্যাপ্পি বাড্ডে’ ।
— ওহ ! তা আমায় আবার কেন ?
— রাস্তার ধারে বড় বাড়ি দেকে ঘুসে গেলাম । মাল্লু লাগবে না ? চাঁদা নিতে এসিচি । বিশ্বকবির জন্যে বিশ্ব বাংলা ধামাকা চাই ! আপনার যা বাড়ি , আমাদের ইনভিটিশন বলচে , আপনি রীচ গাই । মানে মালদার গরু ।
— গরু ?
— সম্মান দিলাম আর কি । এখন তো গাই’দের গানই গাই !
— আচ্ছা , আচ্ছা । তা ‘বাড্ডে’তে কী হচ্ছে ?
— কী হচ্চে না বলুন ? ইনগ্রেশনে আসচেন মিস্ চুলবুলি ।
— চুলবুলি ?
— ইয়েস । “ধা নি সা রে” খ্যাত সিঙ্গার । আপনি টিবি দেকেন না , নাকি ?
— টিবি তো আমার নেই , বাবা ! তা মিস চুলবুলি কি রবীন্দ্রসংগীত গান ?
— গান । তবে সে হল এস্পেরিমান্টাল রবীন্দসংগীত । মোমবাতি হাতে ড্যান্স করতে করতে যকন পোদীপ জ্বালবেন না , আহাঃহাঃ , কবির ছবিও নেচে উঠবে । শুনিচি কবি নাকি শান্তিনিকেতনে নিজেই খুব ড্যান্স করতেন , গালফেন্ড নিয়ে । ওনার অনারেই তো চুলবুলি কে আনচি ।
— সত্যি বাবা , কবি বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন । তা আমিও শুনেছি , রবীন্দ্রনাথ কবিতা ভালই লিখতেন । তোমাদের সভায় কবিতা হবে না ?
— কী যে বলেন ? আমাদের দাদা পুরো সান্সকিতিক মানুষ । নিজেও কবিতা লেকেন । আমাদের বলে দিয়েচেন , ফানশন সিরিয়াস করতে হবে । কবিতা , বত্তিতা সব থাকচে । রক কবি ভোলা খ্যাপা ‘দুজ্ঞম গিরি’ রিসিট করবেন । তবে কবিতার মিউজিকটা এখনো কোন্ ব্যান্ডকে দেব , সেটা ঠিক হয়নি ।
— কবিতার মিউজিক ?
— ইয়েস ! আরে পিচনে গীটার , ড্রাম এসব না দিলে , ঐ প্যানপ্যানানি কে শুনবে , দাদ্দু ?
— কিন্তু দুর্গমগিরি তো রবীন্দ্রনাথের লেখা নয় !
— নয় ? নাই হল । কোনো কবি তো লিকেচে , নাকি ? আসল কতা হল , রিদিম চাই । ঐ কবিতায় হেব্বি রিদিম আছে , দেশোপেমও আছে । দাদা খুশি হয়ে যাবেন ।
— ওহ ! আর বক্তৃতা কে দেবেন ?
— কেন , হাতকাটা কাল্লুদা !
— এই হাতকাটাবাবু কী করেন ,বাবা ?
— ও বাবা , এঁর কতা জানেন না ? আমাদের কেলাবের পেসিডেন । আগে মাসল দেকাতেন , এখন বিরোধীদের সাথে টাস্ল দেকাচ্চেন । তাইতেই বাঁ হাতটা স্যাক্রিফাইস কল্লেন । রবীন্নাথের সাথে খুব মিল ।
— কীসের মিল ?
—- কবিও ইস্কুল পালিয়েচেন , ইনিও ইস্কুল পালিয়েচেন । এক কাটি এগিয়ে দু একটা মাস্টারকে ঠেঙিয়েওচেন । কবি বলেচেন , “খোলা হাওয়া” চাই । কাল্লুদা তো অক্সিজেন সিলিন্ডার বগলে নিয়েই ঘোরেন । মাঝেমাঝে চুক চুক টেনে নেন । তারপর কবির বিজনেস ফ্যামিলি । এনারও পোমোটিং এর বিশাল ব্যাওসা । একানে কোথায় যেন একটা ঠাকুর বাড়ি আছে , সেটাও ভেঙে মাল্টিপারপাস তুলবেন বলেচেন । আবার কবি গেয়েচেন , “আমার পানের মাজে সুদা আচে , চাও কি ?” কাল্লুদাও পাণের মাজেই থাকেন । তার উপর , ওনার তের নম্বর গাল ফ্রেন্ডের নাম সুদাই ছিল । শুনিচি বৌদির সাতে কবির এট্টু ‘ইয়ে’ ছিল । কাল্লুদার তো পাড়া সুদ্দ সব বৌদির সাতেই….! হেঁ হেঁ ! তাই কাল্লুদাই আমাদের লেন্স দিয়েচেন , কীকরে কবির পদান্ন ফলো কত্তে হয় ।
— আচ্ছা , আচ্ছা । তা অনুষ্ঠান শেষ কী দিয়ে হবে ?
— শ-রচিত রবীন্নসংগীত দিয়ে ।
— সেটা কী বাবা ?
— দেকুন , একন রবীন্নসংগীত অনেক পোকার । রক-রবীন্ন , পপ-রবীন্ন , ধুপদী- রবীন্ন , জীবনমুখী-রবীন্ন। তেমনি শ-রচিত রবীন্ন। গাইবেন কলি কেতা ।
—কলিকাতা তো এই শহরের নাম ?
— কলিকাতা নয় , কলি কেতা । হেব্বি পপুলার সিঙ্গার । পুরো সুশীল । ক’টা ওনার লাকি এলফেট ।
— এই কলিবাবু নিজেই রবীন্দ্রসঙ্গীত লেখেন ?
—ইয়েস! তবে একে বলে অনুপ্পেরণা । বাংলায় ইসপিরেশন । কবির অনুপ্পেরণায় লেখেন , আবার গানও ।
— ওঁর একটা গান শোনাও তো বাবা ।
— মুশকিলে ফেললেন দাদ্দু । আমার গলায় কি আর মেল্ডি আচে ? তার উপর চিয়ার লীডার নেই !
— চিয়ার লীডার?
— তো ? আরে আমি ওই পুচিপুচি মেয়েগুনোর কতা বলচি , যারা না-পোশাক পরে গানের পিচনে ড্যান্স করবে আর হাসবে । ব্যাস , অডিয়েন্স চীয়ার ! নইলে , হাম্মোনিয়াম বাগিয়ে ঐ টিবি-রুগীর টিকটিকানি কে শুনবে , বাওয়া ?
— না-পোশাক মানে ?
— মানে পোশাক আচেও বটে , আবার নেইও বটে । ঐ যে কবি বলেচেন , ‘এটা নয় , এটা নয় , অন্য…..’ ।
— থাক থাক বাবা , বুঝেছি । তা গানের লীরিকটা , মানে পদ্যটাই একটুখানি শুনিয়ে দাও ।
—“ভেঙে মোর ইয়েল লকটা , দুষ্টু লোকটা ইলোপ করবে ?/ও সোনিয়ে মেরি !/ডার্লিং , আমায় টানলে , বাকিরা জানলে , হামলে পড়বে !/ও সোনিয়ে মেরি !”
— বাহ । বাহ । কিন্তু কিছু শব্দ যেন ঠিক বাংলা বলে মনে হল না , বাবা !
— দাদ্দু , বেঙ্গলি একন ইন্টারন্যাশনাল ভাষা । আপনাদের মতো নীরো মাইন্ডেড লোকেদের যুগ আর নেই । একন বাংলায় এট্টু ইংলিশ , এট্টু হিন্দি , এমনকি তামিল , হিব্রুও থাকতে পারে । এটা বিশ্ব বাংলার যুগ । যাগ্গে অনেক বকালেন । নিন , বিল নিন । মাল্লু ছাড়ুন ।
— সে কি বাবা, টাকা দেবার আগেই , বিল কেটে দিলে ।
— নিচ্চই । এটা যুগের ধম্মো । ডিসিশন বিফোর ডিস্কাশন । দাদার শিক্কা বলে কতা !
— দেখ বাবা , আমি পুরোনো দিনের মানুষ । আমার অতো টাকাপয়সা নেই।। তোমরা ‘নভেল’ কবির জন্মদিন করবে।। তাই এক অসহায় কবির একটা ‘নোবেল’ জিনিস তোমাদের দিচ্ছি।। খাঁটি সোনার । এ দিয়ে তোমাদের প্রায় সব খরচই মিটে যাবে ।
— একি।, এ তো একটা মেডেল।। অন্দকারে ঠিক দেকতে পাচ্চি না।। তবে ভারি আচে ।
— হ্যাঁ বাবা , ভারিই বটে।। ঘরের চোরে চুরি করবে বলে , এদ্দিন লুকিয়ে রেখেছিলাম , নিজেই।। এখন সময় এমন , যে এর ভার আমি আর বইতে পারছি না। এ মেডেল তোমাদেরই মানায় , বাবা ।
— থ্যাঙ্কু দাদ্দু । তবে আপনাকে স্যাড লাগচে । ছেলেরা যে কেয়ার টেক করে না , উলটে টাকা পয়সা হাপিস করে , দেকেই বুইতে পারচি । সেরম হলে বলবেন।, পেঁদিয়ে সুইজারল্যান পাটিয়ে দেব । আর হ্যাঁ , বাড়িটা কাল্লুদা-কে দিয়ে , আমাদের পাড়ার বিদ্দাবাসে চলে আসতে পারেন । হেব্বি জায়গা । হসপিটাল কাচে ,শ্মশান কাচে । কোনো পবলেম হবে না । মিত্যু পেলে , সোজা চিতেয় গিয়ে লম্বা হয়ে যাবেন । বিদ্দাবাসের নাম– “ঘাটের কতা” ।
—- আচ্ছা বাবা । “ঘাটের কথা” আমি ভেবে দেখব ।
— চলি তাইলে । ফানশনে আসবেন কিন্তু । সিনিয়ার সিটিজেন চেয়ার ম্যানেজ করে দেব । চুলবুলির একদম সামনে ! বাই দাদ্দু ।

অন্ধকার নেমে গেলে , বৃদ্ধ মানুষটি সদরের পাশের মূর্তিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন । করুণ হেসে বললেন — “ভাগ্যিস , আপনিও দাড়ি রেখেছিলেন , বাবামশাই । তাই আজ আপনার সেলফি হল” ।
তারপর , ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেলেন । পড়ার টেবিলের সামনে বসে , হলদে মলাটের বইটি টেনে নিলেন কম্পিত হাতে ।
বই-এর একটি কবিতার শেষ-লাইন লাল কালিতে কেটে , বৃদ্ধ লিখলেন —
“আমায় কেন দিলে আমার সকল শূন্য করে ?”
সংগৃহীত

Advertisements

ছোট্ট গল্প : কন্যা সন্তান

iman-maleki-1

মাথা নীচু করে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “নিজে পড়ে জয়েন্টে ভালো rank করেছো ঠিকই কিন্তু পড়তে তো হবে প্রাইভেটেই…! আবার তোমার ভাইও বলেছে ইঞ্জিনিয়ারিংই পড়বে। এত খরচা আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তুমি জেনারেলে গ্রাজুয়েশনটা করো। আর অমিয় বাবুর সাথে কথাটা বলাই আছে। বিয়েটা হয়ত সেকেন্ড ইয়ারেই হয়ে যাবে তোমার। ছেলে হিসাবে তোমার ভাইএর চাকরী পাওয়াটা বেশী দরকার।”

২০ বছর পর –

টেলিফোনে মেয়ের কান্নার আওয়াজ- “বাবা আমায় ক্ষমা কর। আর আমাদের বাড়িতে কোনদিনও এসো না। তোমার শেষ কেমোথেরাপির পর তোমার জামাই অমর কে বলেছিলাম, বাবা এরপর থেকে আমাদের সাথেই থাকুক, ভাইও বিদেশে। তার উত্তরে আমাকে বললো, ‘নিজের তো এক পয়সা রোজগার করার মুরোদ নেই, একটা পাতি গ্রাজুয়েট…এখন নিজের সাথে সাথে নিজে বাবাকেও আমার ঘাড়ে….লজ্জা করল না বলতে‘?”

Writer : Unknown

প্রার্থনা

তোমার বাহুর বন্ধনে বাঁধো মোরে,

রাখ মোরে তোমার দৃষ্টিতে,

দিয়োনা যেতে আমারে দূরে।

হতে দিয়োনা আমারে শিকার,

নিয়ে চল দূরে কোথাও,

প্রেমে যেন পড়ি না আবার।

বাঁধো মোরে তোমার আলিঙ্গনে,

বাহুপাশে কর মোরে বন্দী,

যেতে দিয়োনা আমারে বিপথে।

হতে দিয়োনা আমারে শিকার,

নিয়ে চল দূরে কোথাও,

প্রেমে যেন পড়ি না আবার।

~~~~~~~~

31 Dec 2016, Copyright © Bichitraa 2016, all rights reserved.

Take me away” by Asha inspired me to compose this poem in Bengali.