আলমারি

আলমারি

নরেন্দ্রনাথ মিত্র
স্ত্রীর সঙ্গে রোজ ঝগড়া হয় পরিতোষ সরকারের। দামি কাপড়চোপড় রাখবার মতো একটা আলমারি নেই ঘরে। ট্রাঙ্কে সুটকেসে অতি কষ্টে জিনিসপত্র গুঁজে গুঁজে রাখতে হয়। একটা কিছু বার করতে হলে একেবারে লণ্ডভণ্ড, কুরুক্ষেত্র কাণ্ড। সুপ্রীতি বলে, “আমি আর পারব না তোমার ঘর গোছাতে। আর এই দামি দামি জিনিসগুলি যদি নষ্ট হয় তার জন্যেও আমাকে দায়ী করতে পারবে না।“ পরিতোষ নির্লিপ্ত থাকবার ভাণ করে বলে, “ বেশ, করব না দায়ী। সব দোষ তুমি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ো।” সুপ্রীতি রাগ করে বলে, “দোষ চাপালে আর কী হবে। গেলে আমার জিনিসই সব যাবে।”
তা ঠিক। বসনভূষণের ভাগ সুপ্রীতিরই চৌদ্দ আনা। পরিতোষের নিজস্ব বলতে আছে একটা গরদের পাঞ্জাবি, পৈত্রিক আমলের একখানি শাল। বিয়ের পাওয়া আংটি আর সোনার বোতাম। পরিতোষ কিছুতেই ব্যবহার করে না। ওর নাকি লজ্জা করে। তবে ঘড়ি আর পেনটি সঙ্গে সঙ্গেই রাখে। সুপ্রীতি খোঁচা দিয়ে বলে, “ও-সবও তো গয়না। ওগুলিও তো আমার বাবার দেওয়া জিনিস।”

পরিতোষ জবাব দেয়, “তোমার বাবার দেওয়া সব জিনিসের ওপরই যে আমার বিরাগ একথা, বলতে পার না। “ সুপ্রীতি বলে, “থাক থাক, আর রসিকতা করতে হবে না। তুমি যে কত ভালবাস আমাকে তা জানা আছে।”

বছর দশেক হল বিয়ে হয়েছে ওদের। তার এক বছর পর থেকেই এ ধশরনের খোঁটা শুনতে হচ্ছে পরিতোষকে। শুনতে শুনতে কান-সওয়া হয়ে গেছে।

কিন্তু পত্নীপ্রীতির যে নিদর্শন সুপ্রীতি স্বামীর কাছে চায় তা এনে দেওয়া তার পক্ষে দুঃসাধ্য। গ্লাস-বসানো ইস্পাতের আলমারির দাম অন্তত শ’তিনেক টাকা।

পরিতোষের দেড় মাসের মাইনে। বিমা কোম্পানির কেরানি যদি অমন নবাবি করে তার সংসার থেকে ছ’মাসের মধ্যে অভাব অনটন দূর হবে না। শুধু স্ত্রীর আবদার মেটালেই তো চলবে না পরিতোষকে। সংসারে পোষ্য অনেক। দুটি ছেলেমেয়ে হয়েছে। একটি বোন কলেজে পড়ে। ভাইটিও সামনেবার স্কুলের গণ্ডি ছাড়বে। খরচ কি কম! পরিতোষ যুক্তি দেখায়, “ তা ছাড়া অমন দামি আর ভারি জিনিস ভাড়াটে বাড়িতে এনে রাখতে নেই। টানাটানিতে কম হাঙ্গামা-হুজ্জোত পোহাতে হয়? কোথায় কখন থাকি তার কি কিছু ঠিক আছে? আমাদের তো সারা শহর ভরে বাসঘর আর বাসরঘর ছড়ানো। আজ বেলেঘাটা—কাল পাথুরেঘাটা, আজ টালা, কাল টালিগঞ্জ। একটু স্থিত হয়ে বসে নিই—।”

সুপ্রীতি বলে, “হুঁ, কবে তুমি চৌরঙ্গিতে বাড়ি করবে তারপর সব ফার্নিচার আসবে, সেই ভরসাতেই থাকি।” দু-চারদিন যায়, আর সুপ্রীতি সেই আলমারির কথা তোলে। বলে , “ আজও গিয়েছিলাম বিডন রোয়ে সুচিরাদের বাড়ি। কী চমৎকার আলমারিই না কিনেছে। শাড়ি রাখ, গরম কাপড়চোপড় রাখ, সব ব্যাপারেই সুবিধে। গয়নাগাঁটিও বেশ নিশ্চিন্তে রাখা যায়। কেউ খুলে নিয়ে যাবে এমন সাধ্য নেই।

অনেকগুলি ড্রয়ার। যেটায় যা খশি রাখ। তারপরে গ্লাস সেট করা আছে। তুমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তার সামনে বসে দিব্যি দাড়ি কামাতে পারবে।” পরিতোষ চোখ কপালে তুলে বলে, “ওরে বাবা। ওই আলমারি যদি একবার কিনে বসি তাহলে কি সারা জীবনের মধ্যে আমার ব্লেড কেনার পয়সা জুটবে?”

সুপ্রীতি রাগ করে পাশ ফিরে শুতে শুতে বলে, না জোটাই উচিত। তুমি দাড়ি গোঁফ রেখে বনে চলে যাও। বিয়ে করাই তোমার ভুল হয়েছিওল।”

পরিতোষ স্বীকার করে বলে, “ভুলটা বড় পরে ধরা পড়েছে। এখন আর শোধরাবার জো নেই। কিন্তু তুমি বোধ হয় এহনও শোধরাতে পার। সুচিরাদের বাড়িতে কিছুদিন যাতায়াত বন্ধ করে দাও। তাহলে জিনিসটা তোমার চোখেও পড়বে না। মনও খারাপ হবে না।” সুচিরা দত্ত কলেজে বছর দুই সুপ্রীতির সহিপাঠিনী ছিল। বড় ডাক্তারের মেয়ে মেজো ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

সে-রাত্রে সুপ্রীতি পরিতোষের সঙ্গে কিছুতেই কথা বলল না। তাতে পরিতোষ যে খুব চিন্তিত হল তা নয়। এমন মান ভঞ্জনের পালা দাম্পত্য-জীবনে ঘুরে ফিরে আসে। না আসলেই বরং জীবন একঘেয়ে হয়ে যায়। কিন্তু দিন দুই বাদে এক কাণ্ড ঘটল তাতে পরিতোষ আর অত অবিচলিত থাকতে পারল না। অফিস থেকে ফিরে ঘরে এসে ঢুকতে না ঢুকতেই ছোট বোন অঞ্জলি আর ছোট ভাই রন্টু একসঙ্গে এসে খবর দিল, “দাদা, সর্বনাশ হয়েছে।”

পরিতোষ উদ্বিঘ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কো হয়েছে রে? খোকন আর বুড়ি কোথায়? কোন অ্যাক্সিডেন্ট?” অঞ্জলি আশ্বাস দিয়ে বলল যে, সে সব কিছু নয়। পরিতোষের ছেলেমেয়ে দুটি ভালই আছে। কিন্তু সর্বনাশ হয়েছে তার স্ত্রীর। ট্রাঙ্কের ভিতরে পোকা ঢুকে বেনারসি আর মুর্শিদাবাদি সিল্ক দু’খনাই কেটে ফেলেছে। ঘরের দিকে ভাল করে তাকিয়েই ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার বুঝতে পারল পরিতোষ। সারা ঘরময় সুপ্রীতির পোশাকি শাড়িগুলি ছড়ানো। পুজোর সময় আর বিবাহবার্ষিকীতে পঁচিশ ত্রিশ টাকার যে সব শাড়ি পরিতোষ স্ত্রীকে উপহার দিয়েছে সব মেঝেয় লুটোতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আর পাশের ঘরে তক্তপোষের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে সুপ্রীতি। এক পাশে কীটদষ্ট বেনারসিখানা পড়ে রয়েছে। দোরের কাছে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে খোকন আর বুড়ি। পরিতোষের সাত আর পাঁচ বছরের দুটি পুত্রকন্যা। পরিতোষ স্ত্রীর পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলল, “বোধহয় এখনও রিপু করিয়ে নিলে চলবে। আর অন্য শাড়িগুলিও বাক্সে তুলে রাখ। নষ্ট করে লাভ কী।”

সুপ্রীতি বলল, “তুলে আর কী হবে। ওই ভাঙা বাক্সে তুলে রাখাও যা, বাইরে ফেলে দেওয়াও তাই। একই কথা। আমার কিছু আর রাখবার দরকার নেই। তুমি রাখতে হয় রাখো।” শেষ পর্যন্ত পরিতোষ প্রতিশ্রুতি দিল, এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রীতির পছন্দমতো আলমারি সে কিনে আনবে। একই সঙ্গে যা মজবুত আর শৌখিন। বড় আয়না-বসানো আলমারি। পাশাপাশি দাঁড়ালে, দু’জনের প্রতিচ্ছবি যাতে ফুটে উঠবে। ঘরে একখানা বড় আয়না না থাকলে কি চলে। আয়্নায় তো শুধু মুখই দেখা যায় না, সুখও দেখা যায়। দু’খানা সুখী পরিতৃপ্ত মুখের প্রতিবিম্ব। তার চেয়ে বড় ঐশ্বর্য আর কী আছে।

আলমারি তো কিনবে। কিন্তু তিনশো সাড়ে তিনশো টাকা কোত্থেকে জোগাড় করবে পরিতোষ। হাজার দুই টাকার ইন্সিওরেন্স আছে। তার থেকে…ধার নেওয়া যায়। কিন্তু সুপ্রীতি বলল, ‘ খবরদার ও টাকায় তুমি হাত দিতে পারবে না।”

ব্যাঙ্কে একটা নামমাত্র একাউন্ট আছে। সর্বসাকুল্যে তাতে শখানেক টাকাও হবে ক না সন্দেহ। পরিতোষ বলল, “নিজেদের আলমারি্ত আনতে গিয়ে কি পরের সিদুকে হাত দেব?”

সুপ্রীতি বলল, “কে তা দিতে বলেছে? দরকার নেই এখন কিনে? পুজোর সময় যদি বোনাস টোনাস পাও তখন দেখা যাবে।”

কিন্তু পরিতোষের মনটা খুঁত খুঁত করতে থাকে। কথা যতদিন দেয়নি ততদিন একরকম ছিল। কিন্তু কথা দেওয়ার পর জিনিসটা কিনে না আনতে পারলে স্ত্রীর কাছে আর মান থাকে না। সুপ্রীতি তাহলে ভাববে পরিতোষ একেবারেই পথের ফকির। এত বড় শহরে তিনশো সাড়ে তিনশো টাকা সংগ্রহ করে আনার মতো ক্ষমতাই নেই তার।

সুতরাং পরিতোষ ধারের চেষ্টায় নামল। ক্রেডিট মানে কৃতিত্ব। যার যত ধার বেশি, তার বুদ্ধির ধার তত অসামান্য। গোপনে দুওজন সহকর্মী অফিসারের কাছ থেকে শ’খানেক টাকা নিল। পুরনো সহপাঠীদের মধ্যে একজন ইটের কারবার করে। টোকা দিয়ে দেখল সুরথের হৃদয় অতখানি শক্ত হয়ে যায়নি। জরুরি দরকার এবং অসুখবিসুখের দোহাই দেওয়ায় সে শ’দুইই টাকা দিল। বাকি পঞ্চাশ টাকা তুলল নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে। মনটা তবু খুত খুত করতে লাগল, কোথায় যেন হীনমন্যতা আছে এই ধার করার মধ্যে। বন্ধুদের কাছে হাত পাততে গেলে যে হতমান হতে হয় তাতে পরিতোষের কোনও সন্দেহ নেই।
টাকা জোগাড় হওয়ার পর সেদিন বিকাল বেলায় স্ত্রীকে নিয়ে যখন জিনিস কিনতে বেরুল তখন মনে আর তেমন গ্লানি রইল না পরিতোষের। এই উপলক্ষে সে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। সুপ্রীতির নিষেধ সত্বেও শ্যামবাজার থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে চলল বরবাজারের দিকে। পথে স্ত্রীকে নিয়ে ভাল একটা রেস্টুরেন্টে খেল। সুপ্রীতি হেসে বলল, “জিনিসটা আগে কেনা হোক। পথেই যদি এত টাকা উড়িয়ে দাও তাহলে জিনিসটা কিনবে কী করে।”

পরিতোষ বলল, “বিশ্বাস কর, এই টাকা ক’টা ওড়াবার শক্তি আমার আছে।”

সুপ্রীতি বলল, “কিন্তু কেন এত ব্যয় করছ শুনি। আজ তো আমার ম্যারেজ ডে অ্যানিভারসারি নয়, কি অন্য কোন উৎসব-টুৎসব নয়।”

পরিতোষ বলল, “আজ আলমারির জন্মোৎসব। আর সে আলমারি শুধু ইস্পাত দিয়ে তৈরি নয়, আমাদের দু’জনের আনন্দ দিয়ে তৈরি।”

সুপ্রীতি বলল, “থাক, কবিত্ব রাখ। ফুলটুল কেনার সময় ওরকম কবিত্ব মানায়।”

পরিতোষ প্রতিবাদ করল, “আর আলমারির বেলায় বুঝি কবিত্ব বেমানান? আজকালকার কবিদের ও ধরনের পক্ষপাত নেই।”নেতাজী রোডে গাড়িটাকে জোর করে ছাড়িয়ে দিল সুপ্রীতি। বলল, “আর মিটার বাড়িয়ে লাভ নেই। এবার হেঁটে হেঁটে দেখতে দেখতে চল।”

পরিতোষ বলল, “ অন্য জিনিস দেখব কী। তোমাকে দেখেই কূল পাইনে।”

সুপ্রীতি মুখ টিপে হেসে বলল, “সত্যি?”

পরিতোষ বলল, সত্যি ছাড়া আর কী। এমন সাজ সেজে এসেছ যে চেনাই যায় না।”

সুপ্রীতি খুশি হয়ে বলল, “বাড়াবাড়ি কোরো না।”

ওরা প্রথমে নামজাদা দোকানের দামি জিনিসগুলি দেখতে লাগল। জিনিস দেখে চোখ লুব্ধ হয়, কিন্তু দাম শুনে সেই চোখই আবার কপালে ওঠে। সুপ্রীতি বলল, “অত দামি জিনিস কেনার দরকার নেই। তা ছাড়া দেখেনি আরও পাঁচটা দোকান। এত দামের জিনিস নেব, যাচাই করে নেব না?”

দেখতে দেখতে ওরা অপেক্ষাকৃত ছোট একটা দোকানে উঠল। চন্দ এন্ড কোম্পানি। কয়েকটা আলমারি ভালই দেখা গেল। বড় দোকানের অনুকরণে তৈরি হলেও জিনিস খারাপ নয়, দেখতেও বেশ সুন্দর। সেলসম্যান দাম বলল, আড়াইশো। আশ্চর্য, সুচিরার ঘরে যা দেখে এসেছে সুপ্রীতি, অবিকল সেই রকম। শুধু কোম্পানির নাম আলাদা। কত বেশি কমিশন চন্দ এন্ড কোম্পানি দিতে পারবেন তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে হঠাৎ পিছনের অফিস রুম থেকে স্যুটপরা সুদর্শন এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশের বেশি নয়। ছিমছাম শৌখিন পুরুষ।

সুপ্রীতি তার দিকে চেয়ে একটুকাল অবাক হয়ে থেকে বলল, “ নির্মলদা তুমি এখানে?”

সেলসম্যান বলল, “ আমাদের বড়বাবু মিঃ চন্দ। ওঁদেরই তো কোম্পানি।”

সুপ্রিটি খুশিহয়ে বলল, “তাই বল!”

নির্মল বলল, “এবার আমি জিজ্ঞেস করছি, তুমি এখানে!”

সুপ্রীতি বলল, “আলমারি কিনতে। কিন্তু বড্ড বেশি দাম তোমাদের দোকানে।“

নির্মল স্মিতমুখে বলল, “ তা দাম তো একটু বেশি হবেই। জিনিস নেবে দাম দেবে না?”

নির্মল নিজেই যেচে পরিচয় করল পরিতোষের সঙ্গে। নিজেরও পরিচয় দিল। বলল, “সুপ্রীতি আমাদের অঙ্কের প্রফেসরের মেয়ে। অঙ্কের চেয়ে বেশি ভয় করতাম ওকে। এত উৎপাত করত। রাজসাহী শহর সুদ্ধ লোক ওর জ্বালায় অস্থির ছিল।”

জ্বালাটা কী রকমের, অস্থিরতাই বা কী ধরনের তা পরিতোষ নির্মলের মুখের দিকে চেয়ে অনুমান করার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠল না। নির্মলের মুখে হাসি, চোখে চাতুর্য। চেহারায় আভিজাত্য।

খানিকক্ষণ ধরে কুশল প্রশ্নের বিনিময় চলল। পরিতোষের কানে কয়েকটি অশ্রুতপূর্ব সর্বনাম। যে সঙ্কেত ভেদ করবার চাবি তার কাছে নেই। তারপর নির্মল জজ্ঞাসা করল, “কোন আলমারিটা তোমার পছন্দ তাই বল।” সুপ্রীতি উল্লাসের সুরে বলল, “পছন্দ তো সবগুলিই।”

নির্মল বলল, “বেশ তো সবই নাও। পাইকারি দরে দিতে পারব।”

পরিতোষ হাতঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “ আমার একটু তাড়া আছে। একটা আলমারিই নেব আমরা।”

নির্মল বলল, “বেশ তো।” কিন্তু মুশকিলের কথা হল, নির্মল কিছুতেই দাম নেবে না। সুপ্রীতি দামের কথা বলায় হেসেই উড়িয়ে দিল নির্মল। ধমকও দিল দুটো-একটা। পরিতোষের দিকে চেয়ে বলল, “ ওর বিয়ের সময় দেশে ছিলাম না। তখন কিছুই প্রেজেন্ট করতে পারিনি। আজ এটা ওকে দিলাম।”

সুপ্রীতি বলল, “না না সে কি হয়।”

নির্মল বলল, “ না হয় তোমার মাসিমার কাছে দাম দিয়ে এসো। আমি নিতে পারব না।” মাসিমা মানে নির্মলের মা। তিনি আজও বেঁচে আছেন। শেষ পর্যন্ত আলমারিটা বিনামূল্যেই সুপ্রীতিকে গছিয়ে দিল নির্মল। সুপ্রীতি একান্তে স্বামীকে বলল, “আচ্ছা দামটা আমরা অন্যভাবে শোধ করে দেব।”

পরিতোষ নিঃশব্দে রাস্তায় নেমে এল। ধার-করা টাকাগুলি এবার অনায়াসে শোধ দিতে পারবে। কিন্তু অত বড় আলমারিটা যে ঘরজুড়ে থাকবে তাকে ভুলবে কী করে?
রচনাকাল : জুলাই ১৯৫৬

Advertisements

আজকের গল্প : ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা

ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার তৈরী করে …….
তারা প্রথমে গাঁয়ে- মফস্বলে হরিপ্রসন্ন স্কুলে গেঁয়ো বন্ধুদের সাথে লেখাপড়া শেখে ।
তারপর ——-
ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে সকলকে চমকে দেয় ।
তারপর তারা উচ্চতর শিক্ষার জন্য চলে যায় ……
ব্যাঙ্গালোর কিংবা দিল্লী ,কিংবা পুণে …….
সেখানে গিয়ে তারা বড় বড় নম্বর পায় ! পজিশন পায় !
তারপর সেই নম্বর প্লেট গলায় ঝুলিয়ে তারা মস্ত মস্ত কোম্পানীতে ভালো ভালো চাকরি পায় !
প্রচুর স্যালারি ! দামি ফ্ল্যাট ! ভালো গাড়ী ……. !
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ….. এরপর বিদেশের বিমানে গিয়ে বসে ।
পৌঁছে যায় আমেরিকা ,জার্মানি কিংবা আবুধাবী …. অথবা সিঙ্গাপুর কিংবা কানাডা !
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেদের , ঐ সব দেশ টপাটপ কিনে নেয় ।
ঐ সব ব্রিলিয়ান্ট দেশ ,আমাদের ব্রিলিয়ান্টদের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি – গাড়ি
আর প্রচুর ডলারের ব্যবস্থা করে দেয় ….
সেখানে আমাদের ব্রিলিয়ান্টরা সুখে থাকে ।
সুখে থাকতে থাকতে ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা ভুলে যায় তাদের দেশ গাঁয়ের কথা , হরিপ্রসন্ন স্কুলের কথা —
গাঁয়ের বন্ধুদের কথা ক্রমে ভুলে যেতে থাকে !
মনে রাখতে পারে না —– খুড়তুতো , জ্যাঠতুতো সব অসফল ভাই বোনেদের কথা ।
ব্রিলিয়ান্টদের জগতে ইমোশন নেই ! প্রোমোশন আছে ।
ব্রিলিয়ান্টদের অতীত নেই ! কেবল ভবিষ্যৎ , কেবল ফিউচার ।
ছোট চেয়ার থেকে বড় চেয়ার ……নন এসি থেকে এসি ।
ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা বাবা- মা কে মাঝে মধ্যে টাকা পাঠায় ….অ -নে -ক টাকা !!!!
সেই টাকা হাতে পেয়ে ব্রিলিয়ান্টদের বাবার মুখে ফুটে ওঠে হাসি।
মায়ের চোখ ভরে ওঠে জলে ।
ব্রিলিয়ান্টরা এই ন্যাস্টি ইন্ডিয়াতে আর ফিরে আসতে চায় না ।
এত ভিড় ! এত ধুলোকাদা ! এত কোরাপশন !
এসবের মধ্যে তাদের গা ঘিনঘিন করে
তবু যদি কখনও আসে ……..
অনেক অনেক ফরেইন জিনিস নিয়ে আসে ।
মায়ের জন্য ইতালির চাদর , বাবার জন্য ফ্রান্সের সিগারেট .. সঙ্গে জাপানি লাইটার ,
আলো জ্বললেই যা থেকে টুং টাং করে বাজনা বেজে ওঠে ।

ব্রিলিয়ান্টদের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা ……..
ব্রিলিয়ান্টদের ব্রিলিয়ান্ট বানিয়ে তুলতে কেরানী বাবাকে যে কতদিন কর্মক্লান্ত দুপুরে টিফিনে একটা চাপাকলা কিংবা
একটাকার শুকনো মুড়িতে পেট ভরিয়েছেন ……
কতকাল যে মা কোনো নতুন শাড়ী কেনাকে বিলাসিতা মনে করে ছেঁড়া শাড়ীতে দিন কাটিয়েছেন !!!
এসব তথ্য ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে থাকেনা । ব্রিলিয়ান্টদের ল্যাপটপে নায়াগ্রার দূরন্ত জলোচ্ছ্বাস , কিংবা
ভিসুভিয়াসের ছবি থাকে …….
এই শ্যামল বাংলার নদী গাছ , বর্ষার মেঘ —–
এসব হাবিজাবি সেখানে ইনসার্ট করা যায় না ।
ব্রিলিয়ান্টরা সদা ব্যস্ত ! ভীষণ ব্যস্ত …… !
তারা সঙ্গীত শোনেনা , তারা গল্প বা কবিতা পড়ে সময় নষ্ট করেনা ।
তারা আকাশ দেখে না , বৃষ্টিতে তাদের মন খারাপ হয় না ।
তারা কেবল কাজ করে ,কেবল ব্যাস্ততায় ডুবে থাকে ।

বৃষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙ্গে …….শ্রাবণ মাস ।
মা মৃত্যুশয্যায় …..বাড়ি ভর্তি লোকজন ।
অসুস্থ বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন শূন্য চোখে ……
ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছেন ….গোটা বাড়িতে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা !!!
কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে মা জিজ্ঞেস করছেন ….. খোকন এলো ? খো – ক – ন ………….!
ব্রিলিয়ান্ট খোকন তখন ফ্লাইটে …..
সবাই মা কে বোঝাচ্ছে ঐ তো ঐ তো খোকন এলো বলে !
কিন্তু সে ফ্লাইট চলে যাচ্ছে কানাডায়।
কানাডায় কোম্পানীর নতুন শাখা উদ্বোধন।
খোকন যাচ্ছে আরও বড়ো দায়িত্ব নিয়ে , আরও বেশী ডলার ……..
এখানে এই পোড়া দেশে ব্রিলিয়ান্ট খোকনের মা
ছেলের মুখ না দেখেই শেষ বারের মতো চোখ বুঁজলেন …..।।

আমরা এখন ঘরে ঘরে সবাই —— এমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে গড়ে তুলতেই ব্যস্ত…….।
সক্কলে …………..!!!!!!

… (from Whatsapp circulation)

ছোট্ট গল্প : কন্যা সন্তান

iman-maleki-1

মাথা নীচু করে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “নিজে পড়ে জয়েন্টে ভালো rank করেছো ঠিকই কিন্তু পড়তে তো হবে প্রাইভেটেই…! আবার তোমার ভাইও বলেছে ইঞ্জিনিয়ারিংই পড়বে। এত খরচা আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তুমি জেনারেলে গ্রাজুয়েশনটা করো। আর অমিয় বাবুর সাথে কথাটা বলাই আছে। বিয়েটা হয়ত সেকেন্ড ইয়ারেই হয়ে যাবে তোমার। ছেলে হিসাবে তোমার ভাইএর চাকরী পাওয়াটা বেশী দরকার।”

২০ বছর পর –

টেলিফোনে মেয়ের কান্নার আওয়াজ- “বাবা আমায় ক্ষমা কর। আর আমাদের বাড়িতে কোনদিনও এসো না। তোমার শেষ কেমোথেরাপির পর তোমার জামাই অমর কে বলেছিলাম, বাবা এরপর থেকে আমাদের সাথেই থাকুক, ভাইও বিদেশে। তার উত্তরে আমাকে বললো, ‘নিজের তো এক পয়সা রোজগার করার মুরোদ নেই, একটা পাতি গ্রাজুয়েট…এখন নিজের সাথে সাথে নিজে বাবাকেও আমার ঘাড়ে….লজ্জা করল না বলতে‘?”

Writer : Unknown